বোকা তো পোস্টমর্টেম বোঝেনা তবুও শব্দটার যে ধার সেটিকে অগ্রগণ্য হিসাবে নিয়ে প্রিয় সংগীত শিল্পী টি ডব্লিউ সৈনিকের কর্ম জীবনের একটা রিপোর্ট তৈরি করতে চেয়েছে। বোকা এই রিপোর্ট দাখিল করতে চায় আপামর বো-কাপা-ঠকদের নিমিত্তে।
এক জীবনে একটা মানুষ কতো কিছুর সাথে নিজেকে জড়িয়েছে; সাফল্যের সাথে একটা সার্থক জীবন গড়েছে; তার নজির হয়তো খুব বেশি নেই। তবে আপাতত বোকার সামনে টি ডব্লিউ সৈনিক।
সার্থক মানুষেরও থাকে অতৃপ্তি। বোকা জানতে চায় সেসব কথা। যদিও বোকা কোনো সাফল্যের কিংবা সার্থকতার ধার ধারেনা, বরং সহজ সরল চলমান গতিশীল জীবন উন্মোচনেই বেশি আগ্রহী। তাই সৈনিকের সার্থক জীবনটা বোকা গভীরভাবে অনুভব করতে চায়। আর তাই টি ডব্লিউ সৈনিক আজ বোকার সামনে। বোকার প্রথম প্রশ্নটাতেই হয়তো হচকচিয়ে যাবেন সৈনিক; ভাবতে পারেন বোকা তো বোকাই! হেসেও দিতে পারেন উড়িয়ে- ‘যাক চিল যাক উড়ে নীল আকাশে শূন্যতা লয়ে।’
প্রিয় বো-কাপা-ঠক চলুন দেরি না করে- টি ডব্লিউ সৈনিকের গল্পটা শুনি।
প্রশ্ন-১: আপনি আসলে কে? গায়ক, অভিনেতা, ছবি পরিচালক, শিক্ষক নাকি অন্য কিছু; অন্য কেউ?
টি ডব্লিউ সৈনিক: প্রথমত আমি একজন মানুষ। এবং স্বপ্নবাজ, ঘুরে বেড়াতে ভালবাসি। প্রতিদিন নতুন একজন বন্ধু অর্জনের চেষ্টায় থাকি। অন্য সকলের মতোই- সুখে হাসি, কষ্ট পেলে কাঁদি… সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকি এবং নিজেকে ভালোবাসি।
আমি গানের শিল্পী অথবা গায়ক কিনা তা হলফ করে বলতে পারবোনা। আমার নিজের আনন্দে, দুঃখে গান গাইতে ভালোবাসি। আমি আমার নিজের ভালোলাগার তাগিদ থেকেই গান করি…। তবে নিজের প্রয়োজনে ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে লোকসংগীতে সফলতার সাথে তালিম নিয়েছি।
পারিবারিক ভাবেই শৈশব থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছি। অভিনয় এবং সৃজনশীল কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। এখনো নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি। সেই ছোটবেলাতেই শিশু একাডেমি শিল্পকলা একাডেমির.. শিশু বিভাগে গান নাটক নাচ ইত্যাদি করে প্রশংসাও কুড়িয়েছিলাম এবং পুরস্কৃত হয়েছিলাম। আমরা তিন ভাইবোন সেই ছোট বেলাতেই একটি নাচের গ্রুপের সদস্য ছিলাম। সেই গ্রুপটির নাম ছিল ব্রো শিল্পোগোষ্ঠী।
নিলফামারীর জেলা শহরে আমাদের বাসার ড্রয়িং রুমই ছিল খেলাঘর, শিল্পকলা একাডেমি ও অন্যান্য সংস্থার নাচ-গান ও নাট্যচর্চার রিহার্সেল করবার কেন্দ্রস্থল।

প্রিয় শহর নীলফামারীতে থাকাবস্থায়ই শিল্পকলার সকল শাখায় আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম। আসলে আমার পরিবারের সবাই এসব চর্চার সাথে যুক্ত ছিলো। যেহেতু বাবা সাংগঠক ছিলেন আর মা তাতে লায় দিতেন তাই পরবর্তীতে ঢাকায় এসেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে থিয়েটারের (মমতাজউদ্দিন আহমদ) সাথে অভিনয়ের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলাম। ১৯৮৯-২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে-বিদেশে বেশ কিছু নাটকে অভিনয়ও করার সুযোগ ঘটে আমার।
রাক্ষসী, জমিদার দর্পণ, সাতঘাটের কানাকড়ি, কিং লিয়ার, রুপভান, এজন মুন্সির পোস্টার, চোর, বাসন, খামাখা খামাখা, দ্যা লায়ন এন্ড দ্যা জুয়েল ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করেছি। বিভিন্ন নাট্যকর্মশালায়, এবং মূকাভিনয়েও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম।
আমি ছবি পরিচালনা করিনি, আমি ছবির পরিচালক নই। তবে দেশ এবং দেশের বাইরে বেশ কয়েকটি নাটক নির্দেশনা দিয়েছি। এছাড়া ডকুমেন্টারি, বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছি অসংখ্য।
একজন শিক্ষক হতে হলে শিক্ষকতা করবার যে নিয়মিত চর্চা, জ্ঞান থাকা দরকার, সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি শিক্ষক নই। তবে দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও অবজারভেশনটা অনেক সময় বিভিন্ন জায়গায় শেয়ার করেছি, এবং তা করতে ভালো লাগে। এর কারণ হলো আমি যা জানি, যা যা জেনেছি তা মৃত্যুর পরে আমি সাথে নিয়ে যেতে চাই না। আমার গল্প অভিজ্ঞতা শুনে যদি কেউ উপকৃত হয় সেটাই আমার অর্জন এবং সার্থকতা।
আমি… আসলে অন্যকিছু মনে হয়। যার কোন নাম বা পদ পদবী খুঁজে পাওয়া যাবে না। হা হা হা হা।
আমি আসলে… টি ডব্লিউ সৈনিক নামধারী একজন সাধারণ মানুষ।
Table of Contents
Toggleপ্রশ্ন-২: টি ডব্লিউ সৈনিক- এই নাম কেন? আপনার নামের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই।
আমার পুরো নাম- মোঃ হাসান তাইমুম ওয়াহাব সৈনিক। আর টি ডব্লিউ সৈনিক নামটি হওয়ার পেছনে রয়েছে রিঙ্গোর হাত; কলকাতার বিখ্যাত টেলেন্টেড চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক অর্ণব ব্যানার্জি রিঙ্গো।
টি ডব্লিউ সৈনিক: অর্ণব ব্যানার্জি রিঙ্গো বাংলাদেশের ট্রিকায়া, গ্রে অ্যাডভার্টাইজিংয়ে বেশ কিছু দিন কর্মরত ছিলেন। সে সময় রিঙ্গোর সাথে আমি ক্যামেরার কাজ করেছি। তো বিভিন্ন কাজের শেষে টাইটেলে আমার এত বড় নামের প্লেসমেন্টের জন্য যে জায়গা প্রয়োজন হতো তাতে নামটাই যেন বেখাপ্পা লাগতো। তাই একদিন অর্ণব ব্যানার্জী রিঙ্গো আমার নামটি ছোট করে লিখে টাইটেলে বসিয়ে দিলেন- টি ডব্লিউ সৈনিক।
তাইমুম এর ‘টি’ আর ওয়াহাবের ‘ডব্লিউ’ আর শেষের সৈনিক…. ঠিক থাকলো।
আর তখন থেকেই আমি টি ডব্লিউ সৈনিক নামে পরিচিত হয়ে গেলাম।

প্রশ্ন-৩: আপনার জন্ম ঢাকায়, অথচ বেড়ে উঠা… আপনার শৈশব কৈশোর কেটেছে নীলফামারিতে। নীলফামারির গল্প শুনতে চাই…
আমার বেড়ে উঠা, শৈশব কৈশোর কেটেছে নীলফামারী জেলা শহরে। বাবার চাকুরীর সুবাধে আমাদেরকে নীলফামারীতে থাকতে হয়েছে। ওখানেই স্কুলে পড়ালেখা করেছি। নীলফামারী শহরটি আসলে আমি মিস করি। ছোট্ট পরিপার্টি শহর। ফাঁকা, বড় মাঠ সুন্দর বিশাল জেলা স্কুল। একটা ভালোবাসার শহর… যে শহরে সবাই সবাইকে চিনতো। কে কার গুরুজন, শিক্ষক, কে কার ছাত্র, বন্ধু সকলেই জানতেন, সে কারণে তখন আমরা সবাই একটা অলিখিত শাসনে বেড়ে উঠেছি। এর মধ্যেই আমরা নাটক, দেয়াল লিখন প্রতিযোগিতা স্কাউটিং, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনুস্ঠান, উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, উপজেলায় খেলা আন্তঃজেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে নানান বিষয়ে প্রোতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম, সম্পৃক্ত থাকতাম অংশগ্রহণ করতাম।
আমাদের গল্পের বই পড়তে হতো, আমাদের গুরুজনেরা নানাভাবে আমাদের এসব বিষয়ে পাশে থাকতেন। আমরা প্রচুর খেলাধুলা করতাম ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার,হকি আমাদের স্কুল ভিত্তিক জেলাভিত্তিক বছরের বিভিন্ন সময়ে পড়ালেখার পাশাপাশি নানান খেলাধুলার আয়োজন হতো। এবং এগুলো মনে পড়লে এখন বেশ খারাপ লাগে… মনে হয় ইশ্ যদি আবার সেই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম….
আমি কিন্তু আবার দুষ্টুমিতে কম ছিলাম না। আমার জ্বালায় আমার কিছু ফ্রেন্ড ছিল যারা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতো অনেক দূর থেকে। আমি সেই বন্ধুদের বুঝে সাইকেলের চাকার হাওয়া প্রায়ই ছেড়ে দিতাম। এজন্য আমি তাদের কাছে প্যাদানীও খেতাম। আমার মনে আছে এই কারণে আমার টিচার একবার আমাকে খুব মেরেছিলেন।
ক্লাসে আমি কিছু চালাকি করতাম ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়াতে কিছু সুযোগ নিতাম। যেমন তখন আমাদের টিফিন পিরিয়ডে স্কল থেকে টিফিন খেতে দেয়া হতো… এবং সেই টিফিনের লিস্ট ক্লাস ক্যাপ্টেনকে করতে হতো। তো আমি ক্যাপ্টেন হিসেবে ২/৪ জন বেশী দেখাতাম, আর রোল কলের সময়ে সেকেন্ড ক্যাপ্টেন আর আমার দু একজন কাছের বন্ধু বগি উপস্থিতি নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব পালন করতো। এবং সেই বেশী টিফিন গুলো আমরা ঐ ২/৪ জন মিলে ভাগ করে খেতাম।আবার অনেক সময় খেতে পারতাম না… কারন অন্য কয়েকজন বন্ধু আবার বলে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাতে আবার ভাগ বসাতো।
এভাবে আমি আরো একটি কাজ করতাম। সেই বন্ধুদের হাত করে ক্লাস পালিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। এরও আবার একটা কৌশল ছিলো, আর তা হলো একদিনই তো পুরা সিনেমাটি দেখতে পেতাম না। কয়েকটি ক্লাস তো করতেই হতো। তাই নিয়ম করে বন্ধুদেরকে দিয়ে রোল কলের সময় বগি কল দেওয়াতাম। আর যেদিন বগি রোল কলে সাকসেস্ হতাম সেদিন সিনেমা হলে গিয়ে ছবির শুরু থেকে বিরতি পর্যন্ত ছবি দেখতাম।
এরপরে সুবোধ বালকের মত পরের দিন বা অন্য কোন দিন সকালে স্কুলে গিয়ে টিফিন প্রিয়ড পর্যন্ত ক্লাস করতাম আর টিফিনের পরের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হলে গিয়ে বিরতির পরের বাকী অংশটুকু ছবি দেখতাম। এখানে উল্লেখ্য যে, আমি সবসময়ই বিনে পয়সায় সিনেমা দেখার সুযোগ পেতাম… কারন ঐ যে… ছোট্ট শহর কোননা কোনভাবে সকলেই পরিচিত।আমি সেই সুযোগটিই নিতাম। সিনেমাহলের প্রজেকশন রুমে বসে ছবি দেখতাম। আমাদের এক বড় ভাই, খুব ভালো ফুটবল খেলতেন তাকে হাত করেই এই কান্ডটি ঘটাতাম… বিনিময়ে সেই বড় ভাইয়ের কিছু ফুটফরমাশ খাটতে হতো।
শৈশবের স্মৃতি গুলো ভীষণ মনে পড়ে আমার। অনেক ঘটনার কথা মনে পড়ে। একটা গোপন কথা বলি তখন সবেমাত্র সিগারেট খাওয়া শিখেছি…তো তখন একটা সিগারেট খাবো বলে, কতো কস্ট করতে হতো। লুকিয়ে দেড় দুই মাইল দূরে গিয়ে সিগারেট খেয়ে আসতাম।সিগারেট খেয়ে কতবার যে হাত ধুতাম এবং নানা রকম জিনিসপত্র খেতাম যাতে মুখে ও শরীরে দুর্গন্ধ না থাকে। হা হা হা হা হা….
শিক্ষকদের কথা আমার খুব মনে পড়ে। শিক্ষকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মত। এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিলো। আমাদের বাড়ির সকল হাঁড়ির খবর স্যারেরা জানতেন এবং স্যারের বাসায় আমরা যাতায়াত করাতে শিক্ষকদের বাসার ভালো মন্দ সব খোঁজ-খবরই আমরা রাখতাম। বিপদে-আপদে আমরা সবাই সকলের পাশে থাকতাম।
আমি অ্যাসেম্বলি থেকে শুরু করে ক্লাস রুম এবং খেলার মাঠ এবং সবসময়ই কয়েকজন স্যারকে ভিষন জ্বালাতন করতাম।
একবার স্কুলের স্টোর রুমে ব্যাডমিন্টন এবং ফেদার অনেক ছিল আমরা দেখেছি… কিন্তু আমাদেরকে সেই ব্যাডমিন্টন নেট, ফেদার,ব্যাট স্যার দিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন এবং শেষে আমাদের খেলার জন্য তা দেন নি।
তারপর কি আর করা সেই র্র্যাকেট ফেদার নেট দিয়ে ব্যাডমিন্টন তো আমাদের খেলতেই হবে। তখন আমরা একটি প্ল্যান করলাম…এসব আমরা স্কুল থেকে চুরি করবো… এবং শেষমেষ আমরা চুরি করেছিলাম। দুর্ভাগ্য আমরা পরিশেষে ধরা পড়ে ছিলাম পিটুনি খেয়ে ছিলাম তা আজও মনে আছে। সেই জব্বার স্যার,আলী স্যার…আল্লাহ ওনাদের বেহেস্ত নসীব করুন।
আমি ফুটবল ভালোই খেলতাম বিভিন্ন স্কুলের সাথে বিভিন্ন এলাকার স্কুলের খেলা হতো তখন, আমি তখন হায়রে ফুটবল খেলতে যেতাম…৫০টাকা ৬০টাকা ৭০টাকার বিনিময়ে…খুব মনে পরে সেই সময় আমি এই হায়ারে খ্যাপ খেলার টাকা দিয়ে একটি বাইসাইকেল কিনেছিলাম। তখন আমার সে কি ভাব…তাতে আবার গান গাইতে পারি,নাটকে অভিনয় করি…খেলাধুলা বিভিন্ন অনুস্ঠানে অংশগ্রহন করি…একদম অন্যরকম একটা ব্যাপার ছিলো। সকলেই আমাকে একটু আলাদা ভাবে চিনতো। এর মধ্যেই আবার অন্যরকম একটা ব্যাপার ঘটে গিয়েছিলো…বলবো….?
হা হা হা..
নাহ্ বলেই দেই…আরে প্রেম…
হা হা হা… না বুঝে, অব্যাক্ত প্রেম…
আমাদের এক বন্ধু ছিল নাম জামান। শহর থেকে সে একটু দূর থেকে নিলফামারীতে স্কুলে আসতো একটি গাড়িতে করে। সে থাকতো দারোয়ানি টেক্সটাইল মিলস্ এর ভেতরে। সেই টেক্সটাইল মিলস্ এর দুটি মেয়ে নিলফামারীর গার্লস স্কুলে পড়তো। জামান ও ঐ মেয়ে দুজন সহ তারা টেক্সটাইল মিলস্ এর ঐ এক গাড়িতে স্কুলে আসতো। জামানকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ওই মেয়ে দুটি গার্লস স্কুলে চলে যেত।
সেই মেয়ে দুজনের একজনের নাম ছিল রেখা, একজনের নাম ছিল রুপা…
স্কুল শুরুর আগে আমরা সবাই স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালে চেপে বসে থাকতাম, গল্প করতাম,আমি গান গাইতাম…জায়গাটা আমাদের সকলের প্রিয় ছিলো। তো ঐ মেয়ে দুজন যখন জামন কে আমাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে তাদের স্কুলে চলে যেতো..আমাদের সাথে তাদের একটু চোখাচোখি হতো। আমাদের কেমন যেন একটা অনুভব হতো। একদিন জামান আসলো…গাড়ী থেকে নামলো এবং সরাসরি আমার কাছে এসে বললো যে…আগামীকাল আমাদের গাড়ীটা যখন আসবে তুই ঐ গানটা গাইবি… আমি বললাম কোন গানটা? জামান বললো জুয়েলের ঐ গানটা “”” একডালি ফুল তোমার হাতে দিয়ে আমি বলেছিলাম ভালবাসি “””…
আমি তো অবাগ…এবং জানতে চাইলাম কেন…? জামান বললো ওরা শুনতে চেয়েছে… তুই একদিন গানটা ওয়ালে বসে গাইছিলি, ওরা শুনেছে ওদের ভালো লেগেছে তাই তারা রিকোয়েস্ট করেছে। আহ্ তখন তো আমার নিজেকে নায়ক নায়ক লাগছিলো…
পরের দিন আমি স্কুলের ওয়ালে ১৫ মিনিট আগে থেকেই বসে আছি আর গানটা গুনগুন করছি। যথাসময়ে সেই এবং কাঙ্ক্ষিত সময়ে গাড়িটি দেখা গেলো, আমি গাড়ী টা একটু আগে থাকতেই চোখ বন্ধ করে, অনেক মন দিয়ে সুরেলা কন্ঠে, নিখুঁত ভাবে গানটি গাইতে শুরু করলাম। ওমা গাড়ী কাছে আসতেই দেখলাম জামান নেমে আসলো রেখা, রুপা ওই দুইজন কেউই গাড়ীতে নেই। কেমন লাগে…!!!??
যাক্ মনটা বেশ খারাপ হয়েছিলো।
অবশ্য পরবর্তিতে একটা অলৌকিক ঘটনার মতো ঘটনা ঘটেছিলো…
একদিন জামানের আম্মা সহ জামান রেখা নামের মেয়েটির মা সহ তারা আমাদের বাসায় হাজির।
কারণ রেখা নামের মেয়েটির বৃত্তি পরীক্ষা চলছে…সিট পড়েছে আমাদের স্কুলেই। রেখার সাথে রেখার মা সেদিন এসেছে সে উপলক্ষে। পরীক্ষা চলাকালীন এই সময়টুকু রেখার মা আমাদের বাসাতেই থাকবেন আমার আম্মার সঙ্গে পরিচয় হলো, খালাম্মা, জামান পরীক্ষা চলাকালীন সময়টুকু আমাদের বাসায় থাকলেন সময়টা আমাদের ভালোই কাটলো।
এই অল্প সময়ের মধ্যেই মা খালাম্মাদের একটা সখ্যতা তৈরী হয়ে গেলো। পরীক্ষা শেষে যখন মেয়েটি বাসায় ফিরলো খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যেতে চাইলো, তখন আমাদের বাড়ির পরিবেশ দেখে ড্রইংরুমে হারমোনিয়াম তবলা দেখে রেখার মা আমার মাকে জানালেন জানেন রেখা খুব গান গাইতে জানে…আমার মাও কম না.. সাথে সাথেই বললেন, আমার ছেলেও কিন্তু খুব ভালো তবলা বাজাতে জানে।
কি আর করা তখন রেখা গান গাইলো আর আমি তবলা বাজালাম…. বিশ্বাস করেন পর পর তিনটা গান ও আমি একটি গান যে গাইলাম,যে চোখাচুখি হলো আমাদের দুজনের মধ্যে…একেবারে রাজ্জাক, ববিতা ফেল…কখন যে সময় ফুরিয়ে এলো আল্লাহ্!!!! আর আমি কোন গানটি গেয়েছিলাম জানেন…?
হুম্ ঠিক্… সেই গানটি… স্কুলের ওয়ালে বসে চোখ বন্ধ করে যে গানটি বাতাসকে শুনিয়েছিলাম “” এক ডালি ফুল আমার হাতে দিয়ে আমি বলেছিলাম ভালোবাসি “””
এটি আমার একটি চমৎকার, ভালোলাগা, সুন্দর, মনে রাখার মতো শৈশবের স্মৃতি যা মনে পড়লে এখনো ভালো লাগে ছোটবেলায় হারিয়ে যাই। আর ওই গানের আসর টি ছিল শেষ এবং শেষ…এরপর আর রেখার দেখা মেলেনি।
এরপর থেকে কেন জানিনা আমি আমাদের বাড়ির সামনের সব গাছে S+R লিখে রেখেছিলাম।
হাহাহা নীলফামারীতে গেলে সেই গাছগুলোর এখনো দেখা মেলে এস প্লাস আর লিখাটি অনেক মোটা হয়ে গেছে অস্পষ্ট দেখা যায়।
আরো একটি মজার কাহিনী বলি… আমরা তিন ভাই নীলফামারী সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় পড়তাম। সেই সময়ে আমার বেতন ফুল ফ্রি ছিল, যেহেতু আমরা তিন ভাই একই স্কুলে পড়তাম। তো এটা আমার বাসায় আমি জানায়নি, সেই সুবাদে আমি প্রতি মাসেই বেতনের ১৭ টাকা কি ১৮ টাকা (সেই সময়) বাসা থেকে ঠিকই স্কুলের বেতন দেওয়ার জন্য নিতাম এবং সেটা আমার পকেটে রেখে দিতাম, খরচ করতাম, ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়া করতাম। কিন্তু চালাকি একদিন আমি ধরা পড়ে গিয়েছিলাম, যখন মেট্রিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে যাই।
ওই যে বলেছিলাম শিক্ষকদের সাথে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। সেই আলী স্যার একদম আমাদের পাশের বাশাটি ছিল স্যারের। ফরম ফিলাপের দিন বিকেল বেলা৷ স্যার আমাদের বাসায় আসেন এবং আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে বলেন আপনার তো ভালোই হয়েছে একছেলে তো ফুল ফ্রিতে এ পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে। আমার মা তো বলে কি বলেন….!! নাতো!!!? তখন তো আমার গোমর ফাঁস হয়ে গেল… আমি আর কি করবো… তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে দৌড়ে পালিয়ে বেঁচে ছিলাম। পরে মায়ের অনেক বকা খেয়েছিলাম। মা বলেছিল তোর এত বড় সাহস এতগুলো টাকা তুই প্রতি মাসে মেরে খেয়েছিস তোর একবারও বুক কাপলো না…. হাহাহাহাহা…
এরকম আরো শত শত শৈশবের মজার গল্প রয়েছে আমার, তা শেষ করা যাবেনা।
প্রশ্ন-৪: পরিবারের কোন মানুষটা আপনাকে এ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে? তার বা তাদের কথা জানতে চাই।
আমাদের পরিবারের সকলেই সবসময়ই আমরা আনন্দে থাকার চেষ্টা করতাম, খুব যে সুখে ছিলাম তা নয়। কিন্তু আমাদের আনন্দেো বা দুঃখের দিনে, আর সুখের দিনে যাই হোক সময়গুলোকে আমরা মজা করে অতিবাহিত করতে শিখেছিলাম এবং ৃজেনেছি। পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষ মা বাবা ভাই বোন সকলেই আমাদের প্রয়োজনে সুখে দুঃখে সবসময়ই সাথে থাকতো, সাহস, উৎসাহ যোগাতো।
এখনো সেই একই রকম আমাদের পরিবারে বিদ্যমান। তবে আমাকে শিল্পী হিসেবে দেখতে চেয়েছে আমার প্রিয় তিন বোন,পলি আপা, এলি আপা ও মুক্তা। তারা আমাকে গান করবার জন্য ভীষণ উৎসাহ দিতেন এবং আমি গানে নিয়মিত চর্চা করিনা এবং গানে সিরিয়াস না বলে এখনো যথেষ্ট রাগ দেখান। পরিবারের মা, বাবা ভাই, বোন এদের সহযোগিতা উৎসাহ না থাকলে আসলে আমি টি,ডব্লিউ সৈনিক হয়ে উঠতে পারতাম না।
সে ক্ষেত্রে আমি পর্যায়ে আসার পেছনে আমার পরিবারের সকলের অবদান রয়েছে। পাশাপাশি আমার সহধর্মিনী মেঘনা আমার দুই ছেলে কোলাহল কলরব, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শ্রোতাদের কথাও অস্বীকার করা যাবেনা। আজীবন কৃতজ্ঞতা ভালোবাসা এদের সকলের প্রতি ও সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার প্রতি ।
প্রশ্ন-৫: বেলা তো অনেক গেল। জীবনের অনেক বসন্তও পার করে এলেন। এই সময়ে এসে- কেমন লাগছে এই জীবন? কী হয়নি, কী হতে পারতো কিংবা কী চেয়েছিলেন?
দেখতে দেখতে অনেক দূর, অনেক সময় অতিক্রম করে এসেছি। অনেক বসন্তও পার করে এসেছি। এ পর্যায়ে এসে জীবনটাকে কখনো টক,কখনো মিষ্টি,কখনো ঝাল অবার কখনো কখনো বিস্বাদেরও মনে হয়…হয়েছে। তবে আমি এই বিষয়গুলোকে বেশি পাত্তা এবং বেশি গুরুত্ব দেই না বরং এগুলোকে মানিয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি এই ভেবে যে, এগুলো জীবনেরই অংশ।
সত্যি বলতে কি.. আমি এ জীবনে প্রেম করতে পারিনি এটি আমার ব্যর্থতা/ অযোগ্যতা বলতে পারেন।প্রেমে পড়েছি অনেক। আর প্রেম কি জিনিস তা জেনেছি শিখেছি বিয়ের পরে। আমার প্রেম হয়েছে বিয়ের পরে। কিন্তু প্রেমে পরেছি তা না হলেও ৭/৮ শোর মতো হবে… কিন্তু তারা কেউ কখনো বুঝেও নি জানেও নি হাহাহাহাহা….
আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেক মানুষের জীবন আসলে একই রকমের, একই প্যাকেজের।
জীবন হলো সুখ দুঃখ, বেদনা,প্রেম আশা হতাশা, অপ্রাপ্তি, সুখবিলাস, দুঃখ বিলাস,অলসতা,অসুস্থতা, অর্জন,ব্যার্থতা,পাওয়া, না পাওয়ার একটা ফুল প্যাকেজ। প্রত্যেকটি মানুষেকেই জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে এই বিষয়গুলোকে অতিক্রম করতে হয়। এসবকিছুর সম্মুক্ষিণ হতেই হয়।
এখন বিষয় হল এসব কে কিভাবে ট্যাকেল করতে পারল,সাহস ও বুদ্ধি খাটিয়ে এসব জয় ও অতিক্রম করতে পারলো, এটা মানুষে মানুষে পার্থক্য হয় বলেই আমাদের অনেকেরই মনে হয় আমি ওরচেয়ে কেন খারাপ আছি, আমার কেন এমনটি হয়না।
আমি ককেন ওর মত হতে পারিনা, আমার ভাগ্যটাই কেন এমন, অসুখী আছি। এগুলো তাই না ভাবলেই ভালো… আমি তাই সবসময়ই ভাবি আমি অনেক ভালো আছি, আমি সবসময় খুশি থাকার এবং সর্বাবস্থায় ভালো থাকার চেষ্টা করি। কি হতে পারতাম কি হলো না, কি হওয়ার ছিলো…এগুলো নিয়ে খুব একটা চিন্তা করিনা। তবে যখন যা করি তা ভালোলাগা ভালোবাসা থেকেই করি… এজন্যই বুঝি আমি অনেক তৃপ্ত থাকতে পারি। তবে একটি আশা আমার আছে… তা হলো পৃথিবী ঘুরে দেখার।
তাই জীবনের এই পর্যায়ে এসে কেমন লাগছে এ জীবন, কি হয়নি, কি হতে পারতো কিংবা কি চেয়েছিলাম এসব কিছু নিয়ে ভাবীনা। যা হওয়ার কথা, যা হয়েছে, তা আমার একান্তই নিজে যেমন চেস্টা করেছি তাই হয়েছি এবং হয়েছে আর হবেই।
প্রশ্ন-৬: গানটাকে ঠিক কী কারণে অন্যভাবে নিলেন?
গানটাকে ঠিক কেন অন্যভাবে নিলাম, তাতো আপনার সঙ্গে সেদিন বিস্তারিত আলাপ করেছি। প্রফেশনে কারনে করকরে নোটের হাতছানি এবং ক্যামেরার প্রতি নেশা…..
প্রশ্ন-৭: আপনার গান তো প্রেমকে অগ্রাধিকার দেয়, হাহাহ! আসলে জানতে চাই কেমন প্রেমিক আপনি?
আমার গানে প্রেমের অগ্রাধিকার থাকে… তবে আমি আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়েও গান করে থাকি… হাহাহাহা…
বিষয়টা একটু অন্য ভাবে বললাম।
যদি জানতে চান আমি কেমন প্রেমিক? তবে আমাকে বলতেই হয় আমি দুর্দান্ত একজন প্রেমিক যার বর্ণনা, গল্প, প্রমান আপনারা) উপরে পড়েছেন জানতে পেরেছেন।৷ তবে অন্যেদে সকলের মতই আমার একটা হৃদয় আছে, একটা সুন্দর মন আছে, আমি প্রেম করে জানি,প্রেমে পড়তে জানি, আমি সুন্দরের পূজারী, আমি প্রেম দিয়ে মন জয় ও অর্জন করতে পারি এবং একজন কোয়ালিটি প্রেমিকও বটে….
আমি আমার গান দিয়ে প্রেমকে কাছে টেনে নিয়ে আনতে জানি…
হা হা হা হা হা….
প্রশ্ন-৮: কেমন লাগে- যখন পথে ঘাটে দেখতে পান মানুষ আপনার গান গাইছে? আসলে আমাদের শ্রোতারা কেমন শ্রোতা? অনেকেই তো বলে সময়ের সাথে টেস্ট চেঞ্জ হয়, গানে ব্যাপারটা আসলে কী?
তুমি আমার ঘুম, এই গানটি লিখেছেন সোহেল আরমান, সুর করেছেন ইবরার টিপু এবং এই গানটি এত জনপ্রিয়তা পাবে আমি সত্যিই ভাবি নি। এই অ্যালবামে আমার আরো নয়টি গান রয়েছে। আমি ভেবেছিলাম ” নিতেও যে জানতে হয় শেখোনিতা শেখোনিতা তাড়াহুড়োয় ফেলে গেলে ভালোবাসার এই দুপুরটা”” এই গানটি হয়তো দর্শকপ্রিয়তা পাবে বলে ভেবেছিলাম। আমার প্রথম অ্যালবাম তুমি আমার ঘুম যে সময়ে প্রকাশিত হয় তখন রেডিওর চলন চলছিলো বেশ।
একরকম প্রায় সকলি তখন রেডিও শুনতেন,গাড়ি, বিভিন্ন মার্কেটে, রাস্তাঘাটে সবখানেই আমার এ গানটি বাজতে সুনতাম। অনেকই হেডফোন লাগিয়ে রেডিও শুনতেন।আমার বলতে দ্বিধা নেই রেডিওর কল্যাণে আমার এই গানটি খুব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং যিনিই এই গানটি একবার সুনতেন তার পছন্দের গানের তালিকা আমার এই গানটি জায়গা করে নিতো। আর আমি যখন চলতে পথে অথবা কোনখানে আমার এই গানটি বাজতে শুনতাম, দেখতাম… আমার যে কি ভালো লাগতো তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা এ এক অন্য রকম অনুভব… ভিষণ ভালো লাগে আমার।
মজার ব্যাপার এই গানটি কে গেয়েছেন!!! নামটি সেভাবে গানটি প্রচারের ও প্রকাশের প্রায় দশ বরো বছর পরেও কেউ সঠিক জানতেন না যে এই গানটি আসলে কোন শিল্পী গেয়েছেন। এবং এই ব্যাপারটি আমি বেশ ইনজয় করতাম অনেক জায়গায় বলতে শুনেছি এই গানটি গেয়েছেন নামকরা ওমুক শিল্পী তমুক শিল্পী, একেক সময় একেকজনের নাম চলে আসতো। এরকম আমার বেশকিছু মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে এই গানটি নিয়ে। একবার অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় একটা অনুষ্ঠানে একজন শিল্পী আমার এই তুমি আমার ঘুম গানটি গেয়েছিলেন, দর্শক হিসেবে সামনে আমি, শ্রদ্ধেয় অভিনেতা আজিজুল হাকিম ভাই, অভিনেত্রী তারিন, অভিনেত্রী দীপা খন্দকার ও অনেকেই উপস্থিত ছিলাম। তো অনুষ্ঠান শেষে আমরা সকলেই মঞ্চে গেলাম আমাদেরকে সম্বর্ধনা দেয়া হবে বলে।
সেখানে সেই শিল্পী কে আজিজুল হাকিম ভাই ইচ্ছে করেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে… তুমি যে গানটি গাইলে এতো খুব সুন্দর গান এই গানটি জানো কে গেয়েছেন…? তখন আমারই সামনে সেই শিল্পী বাংলাদেশের সেই সময়ের তরুণ এক বিখ্যাত শিল্পীর নাম বলেছিলেন… হাহাহাহা এরপর সেই শিল্পী কে তুমি আমার ঘুম গানের অরিজিনাল শিল্পী এই আমি অধমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন হাহাহাহাহা… সে এক দারুন মুহূর্ত ছিলো। আবার এই গান নিয়ে এখনো আমার অনেক মজার মজার মুহূর্তের সম্মুখীন হতে হয়।
বরাবরই আমি একটু আত্মকেন্দ্রিক এবং প্রচার বিমুখ। মজার বিষয় হল যারা পরবর্তীতে আমার নামটি জেনেছেন যে তুমি আমার ঘুম গানটির শিল্পী “” টি,ডব্লিউ সৈনিক”” …. কিন্তু আমার চেহারার সাথে পরিচিত নন। বিভিন্ন কাজে ভিন্ন অনুষ্ঠানে যখন তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, দেখা হয় এবং জানতে পারেন যে টি ডব্লিউ সৈনিক নামধারী সেই মানুষটি আমি… তখন তাদের চেহারাটা দেখলে আমার ভিশন মজা লাগে।
বিশেষ করে মেয়ে শ্রোতারা যখন আমাকে দেখেন এবং জানতে পারেন আমি সেই টি ডব্লিউ সৈনিক… হাহাহাহা কারণ এই শ্রোতারা সকলেই আমার এই গানটির সাথে একটি চমৎকার চকলেট বয় টাইপ চেহারা কল্পনা করে রেখেছেন। একদিন তো আমাদের বিখ্যাত বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজার ড্রাইভার বুলবুল ভাই আমাকে খুব সবিনয়ে বলেই দিলেন যে ভাই এই গানটির সাথে আপনার চেহারাটা যায়না….হাহাহাহাহা।
তবে আমি ভীষণ ভাগ্যবান আমার এই তুমি আমার ঘুম গানটির বয়স দেখতে দেখতে প্রায় বিশ বছর হতে চললো… এখনো গানটি শ্রোতারা শোনেন, ভালোবাসেন এ আমার পরম পাওয়া।
আসলে গানের শ্রোতারা বেশ আবেগি থাকেন। আবেগ নিয়ে গান শোনেন… যে কারণে যে মানুষটি যখন যেই পরিস্থিতি অতিক্রম করছেন, তিনি সেই সময়ে যদি ওই পরিস্থিতির উপরে কোন গান শুনে থাকেন… তাহলে সে গানটি তার মনে গেঁথে থাকে। তবে গানের কথা, সুর এবং গায়কী একসাথে ব্যাটে-বলে না হলে শ্রোতারা সে গান কখনই নেন না। গানের শ্রোতারাই কিন্তু গানকে বাঁচিয়ে রাখেন তবে সময়ের ব্যবধানে এর কিছু অন্যথা হয় বৈকি। সময়ের সাথে মানুষের, শ্রোতার রুচির পরিবর্তন ঘটে। এখন ইউটিউব এর যুগ মিলিয়ন ভিউ ছাড়া কোন গান কে হিট বলেনা।
গান এখন দেখার ও বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে…. তবে এর বিপরীতে হাজারো গান আছে যেগুলোর মিউজিক ভিডিও লাগেনা, নেই….
সে সব গান এখনো আমরা শুনি। সেগুলোকেই আবার রিমিক্স করে ইউটিউবে ছাড়া হচ্ছে। তাই আমি বলতে চাই এরকম সময়ের প্রয়োজনে গানের চেঞ্জ হবে ধরন চেঞ্জ হবে এবং কখনো দর্শক শ্রোতা গ্রহন করবে আবার তাকে বর্জন করবে আসলে গানের ব্যাপারটা এরকমই। শ্রোতাদের পরিস্থিতির উপরেই বিবেচিত হয় ভালো-মন্দ, হিট, সুপার হিট, এবং ফ্লপ।
প্রশ্ন-৯: আপনার প্রিয় শিল্পী এবং প্রিয় গানগুলোর কথা জানতে চাই। যা আপনাকে অনুপ্রাণিত করে।
ছোটবেলা থেকেই আমি তপন চৌধুরী, এন্ড্রু কিশোর, সুবীর নন্দী,লাকী আখন্দ, মিতালী মুখার্জী, নচিকেতা, সুমন, নিয়াজ মাহমুদ চৌধুরী স্যার এনাদের গানগুলো আমি বেশি শুনতাম, ভালো লাগতো। ওনাদের গায়কী ভীষন ভালো লাগতো। তাদের প্রায় সব গানই আমার পছন্দের ছিল। এনাদের গানগুলি আমি গাইবার চেষ্টা করতাম।
এই গুণী শিল্পীদের গানগুলি শুনেই আমি অনুপ্রাণিত হই, হয়েছি…
প্রশ্ন-১০: আপনার পুরো পরিবারই সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে জড়িত। ঠিক এই সময়ে এসে পরিবারকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চার যে অবস্থান সেটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ছোটবেলায় সেই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চা অনেকাংশে পরিবারকেন্দ্রিকছিলো। একন্নবর্তী পরিবার হওয়াতে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি চর্চা পরিবারেই বেশিরভাগ সময় হতো। আমাদের পরিবারও তেমনই ছিল। আমার মনে হয় মূল কারন ছিল ঐ একান্নবর্তী পরিবার।
এখন তো সামাজিক অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে আমরা আর একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করার সুযোগ পাচ্ছিনা অথবা সুযোগ নেই। এখন আমরা আমাদের প্রয়োজনে, সুবিধার জন্য, জীবিকার প্রয়োজনে আর পারিবারিকভাবে সংস্কৃতি চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই করতে পারছি পারছি না। এর থেকে আমরা আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছি। তবে আশার কথা এই..এই সময়ে পরিবারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চার বাইরেও নিজের চেষ্টায় ঘরে বসেই ইদানিং ইউটিউব ফেসবুক এর কল্যানে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরে অনেক ট্যালেন্ট আমরা খুঁজে পাচ্ছি এবং তারা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে।
প্রশ্ন-১১: যদ্দূর জেনেছি, ১৯৮৯ সালে নীলফামারি থেকে আপনারা ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে আপনার বোনসহ ভর্তি হয়েছিলেন থিয়েটারে। আপনার থিয়েটার যাত্রার কথা শুনতে চাই…
ঢাকায় ১৯৮৯ সালে এসেই আমি এবং আমার বড় বোন ওমেলা আক্তার এলি আপা, জানতে পারি যে থিয়েটারে (মমতাজ উদ্দিন আহমদ স্যার) নতুন সদস্য নেয়া হবে।যেহেতু ছোটবেলায় আমরা দুই ভাইবোন নিলফামারীতে মঞ্চে অভিনয় করেছি তাই আমরা আগ্রহী হয়ে থিয়েটারে দুই ভাই বোন আবেদন করি। এবং আমার বোন অমেলা আকতার এলি আপা ইন্টারভিউ দিয়ে নির্বাচিত হয়ে যায় আর আমি ফেল করি।
কিন্তু তাতে কি থিয়েটারে যাওয়া-আসার সুযোগ আমি পেয়ে যাই আমার বোন এলি আপাকে আনা-নেওয়ার কারনে। আমার খুব মনে পরে, তখন থিয়েটারে নিয়মিত যাওয়া আসা করতেন মঞ্চে অভিনয় করতেন…… আরিফুল হক, তবিবুল ইসলাম বাবু, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, কেরামত মাওলা, কে এস ফিরোজ, তারানা হালিম, আফরোজা বানু, সাঈদা ইসলাম,মহিউদ্দিন ফারুক, আপেল বাশার,রন্জীত কাগা,সুফি শফিকুল আলম,নরেশ ভূঁইয়া, শিল্পী সরকার অপু, মুনিরা ইউসুফ মেমী,রোজী সিদ্দিকী, আফজাল শরীফ, তামান্না ভাবি, অশোক রায় নন্দী, রেজাউল একরাম রাজু, আহসানুল হক মিনু সহ আরো পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পী গণ।
সে সময়ে নিয়মিত থিয়েটার মঞ্চায়ন করতো জমিদার দর্পণ, রাক্ষসী, দুই বোন, কিং লিয়ার,সাত ঘাটের কান্না করি, রুপভান খামাখা খামাকা… ইত্যাদি।
আমি তখন বোনকে থিয়েটারে দিয়ে থিয়েটার অফিসের বাইরের বারান্দার ব্যালকনিতে এসে বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে কে এস ফিরোজ, নরেশ ভূঁইয়া ও অন্যান্যদের ফুট ফরমায়েশ খাটতাম। আমার খুব ভালো লাগতো, মনে হতো আমিও থিয়েটারের অংশ। তো অনেকদিন এভাবে চলে যায়।
তো একদিন আমাকে ডাকা হল এবং কারণটি হলো থিয়েটার জাতীয় শহীদ মিনারে একটি অনুস্ঠানে অংশগ্রহণ করবে এবং সেখান কিছু গান পরিবেশনা করবে থিয়েটার। আর যে কারণে আমাকে ঢাকা হল তা হচ্ছে, গানের সঙ্গে যিনি তবলা বাজাবেন উনি পরের দিন কোরিয়াতে চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন এবং ওই অনুষ্ঠানে তবলা বাজাবে কে…? এই পরিস্থিতিতে আমার বোন যখন বিষয়টি জানতে পারেন তখন আমার বোন এলি আপা ওখানে বলেছিলেন আমার ছোট ভাই সৈনিক ও তবলা বাজাতে পারে এবং সে কারণেই আমাকে ভেতরে ঢাকা হয়েছে।
আর আমি
একারণেই এভাবে থিয়েটারে নিজেকে সম্পৃক্ত করবার সুযোগ পেয়ে গেলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি রেহার্সেল রুমে সেই পাপ্পুভাই আর চিত্রলেখা গুহ হারমোনিয়াম তবলা নিয়ে বসে আছেন এবং আমাকে কাছে ডেকে গানের সাথে তবলা বাজে পরখ করে নিলেন। এবং আমি ভালোভাবেই পরীক্ষায় উর্ত্তীন্ন হলাম। আর এভাবেই আমার থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে থিয়েটারের নিয়ম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আমি থিয়েটারের নিয়মিত মঞ্চনাটক গুলোতে অভিনয় করার সুযোগ পাই এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি থিয়েটারের সদস্যপদ লাভ করি। এবং দেশে বিদেশে অনেকগুলো মঞ্চনাটকে অভিনয় করার সুযোগ হয়।
প্রশ্ন-১২: পরবর্তীতে কোনে কোন প্রযোজনার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন?
আমি নিয়মিত থিয়েটারে অভিনয় করেছি… রাক্ষসী, কিং লিয়ার,সাত ঘাটের কান্না করি, রুপভান, খামাখা খামাকা… ইত্যাদি নাটকে।
এর পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির প্রোডাকশন অরিয়েন্টেড কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে দা লায়ন এন্ড দা জুয়েল নাটকে মিউজিক এবং পারফরম্যান্স করেছি…এর আগে নীলফামারীতে শকুন্তলা,তাসের দেশ,চোর, বাসন, এজন মুন্সির পোস্টার এই নাটকগুলোতে অভিনয় করেছি। উল্লেখ্য মূকাভিনেতা জিল্লুর রহমান জন স্যারের কাছে আমি মূকাভিনয় শিখেছি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় করেছি।
প্রশ্ন-১৩: মঞ্চে আপনার প্রথম নাটকের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাই।
আমার মজার একটা স্মৃতির কথা মনে পরে গেলো… তা হলো আমার জীবনের প্রথম নাটকে,ৃ নাটকটির নাম ঠিক এই মুহূর্তে মনে পরছে না। চোর অথবা বাসন হবে… সেই নটকে একটি দৃশ্যে আমার কাঁঠাল খাওয়ার একটি দৃশ্য ছিলো… তো আমি সে দৃশ্যে এমন ভাবে কাঁঠাল খাচ্ছিলাম যে সে দৃশ্য দেখে দর্শক ভিষণ মজা পাচ্ছিলেন ও প্রচুর হাততালি দিচ্ছিলো… আর আমি সে সময়ে ডায়লগ ভুলে উৎসাহ পেয়ে পুরা কাঁঠালটি খেয়ে ফেলেছিলাম। পরে তো আমার অবস্থা খারাপ।
আরো একটি ঘটনা বলি… তা হলো থিয়েটারের খামাখা খামাখা নাটকের। নাটকের সিকোয়েন্সে কিছু কিউ ডায়লগ থাকে না…? যা শুনে মন্চে এন্ট্রি করি আমরা…ঠিক তেমনি একটি ডায়লগ শুনে আমি খামাখা খামাখা নাটক মহিলা সমিতি মন্চে মন্চায়নের সময় কাছাকছি কিউ ডায়লগের মতো মনে করে দুই দৃশ্য আগেই স্টেজে প্রবেশ করি এবং ডায়লগ দেয়া শুরু করে দেই।আমার চরিএটির নাম ছিলো রন্জু…তখন মমতাজ উদ্দীন আহমদ স্যার আমাকে কিছুক্ষণ সহ্য করে একটি চড় মেরে বলেন… রঞ্জু তোমাকে তো আমি এখন আসতে বলিনি যাও পরে আসবে… আমরা আমরা এখানে কথা বলছি……..
আর আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কেন চর খেলাম না বুঝে গালে হাত দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তখন উইংসের পাশে থাকা অন্যান্যরা আমাকে বোঝালো যে আমি দুই সিকোয়েন্স আগেই এন্ট্রি নিয়েছি। হাহাহাহাহা…. কি একটা অবস্থা তখন আমার….
প্রশ্ন-১৪: প্রয়াত মিশুক মুনীরের সাথে আপনার অভিজ্ঞতা শুনতে চাই। কেমন দেখেছিলেন মানুষটাকে?
শিক্ষক, গুনি ও আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিত, চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর স্যারের সম্পর্কে আমি কিছু বলার যোগ্যতা রাখি না। তবে তাকে আমি ভিশন মনে রাখবো। আমার জীবন ধন্য যে আমি একজন মিশুক মুনীর স্যারের মতো মানুষের স্নেহ, সান্নিধ্য পেয়েছি। এটা আমার জীবনের একটি বড় পাওয়া। আফসোস হয় ওনার সঙ্গে যদি আরো কিছুদিন সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারতাম। তাহলে নিজেকে আরো তৈরি করতে পারতাম, সমৃদ্ধ হতে পারতাম। আরো অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারতাম। ওনার মত মানুষ যুগে যুগে জন্মায় না। ওনার সঙ্গে আমার সরাসরি থেকে, সহযোগী হিসেবে, কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রায় চার বছরের মত হবে।
পরবর্তীতে শেষের দিকে আরো দু একটি কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল।স্যার আমাকে ভিষণ আদর করতেন। ওনার চিন্তা, চেতনা, দৃশ্যকল্প ভাবনা, ক্যামেরার প্রতি দক্ষতা,চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা, কর্মপরিবেশ তৈরি করার দক্ষতা, অধীনস্থ কলিগদের আপন করে নেয়া, পাশাপাশি শাসন, শেখানো, আনন্দ করা,ছবি ডকুমেন্টারি দেখার অভ্যাস,পেইন্টিং বোঝা, বই পড়া, বন্ধুসুলভ আচরণ সবকিছুই ইর্শনীয় ও অনুকরণীয়। ই টি ভি আসবার আগে ও প্যাকেজ শুরু হওয়ার অনেক আগেই স্যারের সাথে আমার পরিচয় হয় ইজু অডিও ভিডিও লিমিটেডে।
যেখানে আমি ক্যামেরার ক্র হিসেবে কাজ করতাম, উনি এখান থেকে ক্যামেরা ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করতেন। আমি সেই প্রতিষ্ঠান ক্যামেরার সহকারি হিসেবে তখন স্যারের সাথে কাজে নিয়মিত যেতাম। স্যারের সাথে আমি অনেকগুলো ডকুমেন্টারি করেছি। দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক “” না “””তে কাজ করেছি। স্যারের সম্মন্ধে বলে শেষ করা যাবে না।আল্লাহ্ স্যারকে বেহেশ্তনবাসী করুন। আমরা গর্ব করে বলতে পারি যে আমাদের একজন মিশুক মুনীর স্যার ছিলেন।
প্রশ্ন-১৫: শুনেছি, স্যান্ডব্যাগে আপনিসহ আরো চারজন বিখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জড়িত। স্যান্ডব্যাগ লিমিটেড’ এর গল্পটা শুনতে চাই। ঠিক কী চিন্তা মাথায় নিয়ে স্যান্ডব্যাগ দাড় করালেন? বাংলাদেশের ক্যামেরা কলা কৌশলীদের জন্য স্যান্ডব্যাগ কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
স্যান্ড ব্যাগ লিমিটেড.…..
স্যান্ড ব্যাগ লিমিটেড তৈরীর পেছনের গল্পটি একটু অন্যরকম আমরা যারা ডিজিটাল ফরমেটে ক্যামেরায় কাজ করতাম এবং করি, আমাদের সকল ক্যামেরাম্যানদের-ই স্বপ্ন ছিলো যে আমরা 35 মিলিমিটার বা সেলুলয়েড ক্যামেরায় কাজ করবো। (এখন যদিও সেল্যুলয়েড ক্যামেরায় কাজ হয় না) এটা আমাদের সকলের, সকল ক্যামেরাম্যানেরই স্বপ্ন ছিলো।
২০০৭/২০০৮ সালের আগে তো এই সেলুলয়েড ক্যামেরা আমাদের দেশে বিএফডিসি ছাড়া কোথাও ছিলনা। এই ফরম্যাটে কাজ করতে গেলেই আমাদের এফ,ডি,সির সহযোগিতা সহ তাদের ক্যামেরার প্রয়োজন হতো। এবং আমাদের তাদের কাছেই যেতে হতো এবং সেখানকার সহযোগী এবং সংশ্লিষ্টরা যা আমাদের বলতেন, বুঝাতেন তাই আমাদের মেনে নিয়ে কাজ করতে হতো। এই ফরমেট টাকে ওনারা আমাদেরকে রকেট সাইন্স রকেট সাইন্স একটা ব্যাপার হিসেবে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। বিষয়টা এরকম আরে তোমরা বাবারা প্লাস্টিক ফরমেটের ক্যামেরাম্যান, আর এটা হচ্ছে রকেট সাইন্স এ তোমরা এত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে না।
আগে আমাদের সাথে ৫/৭ বছর এসিস্টেন্সি করো তারপরে তোমরা বুঝতে পারবে।আরেকটা খুব হাস্যকর বিষয় ছিল সেই সময়ে… ক্যামেরায় লুক থ্রু করতে গেলেই মিষ্টি খাওয়াতে হতো এবং এই ক্যামেরা কাছাকাছি খুব একটা আমাদের, অন্য ডিপার্ট্মেন্টের ও ক্যামেরাম্যানদের যেতে দেওয়া হোত না বারন করা হতো। কোন কিছু জানতে চাইলে কি কি জানো বোঝানোর চেষ্টা করতো এবং তারা বোঝাতে চেষ্টা করত যে বাবা এটা তোমাদের কাজ না তোমরা তোমাদের কাজ করো এটা বিশাল ব্যাপার এবং সহযোগিতা খুব একটা পেতাম না। আমরা যে ক্যামেরাম্যানরা আগ্রহি হয়ে এই ক্যামেরায় কাজ করতে চাই…. জানিনা মনে হয় তারা এ বিষয়ে একটু ভীতসন্ত্রস্ত থাকতো। পরেনা যদি আবার তাদের কাজ শেষ হয়ে যায়, তাদের জায়গা যদি আমারা নিয়ে ফেলি। তারা যদি কমর্হীন হয়ে যায়, তাদের কাজ কমে যায় এরকম চিন্তা ভাবনা বোধহয় তাদের ছিল…( আমি ভুলও বলতে পারি) আমার মনে হয় আমরা সব ক্যামেরাম্যান ভাইরা এরকম সিচ্যুয়েশন কাছ থেকে ফেস করে এসেছি। আবার সবাই যে একি রকম তা নয় কেউ কেউ আমাদের সহযোগিতাও করেছিলো।
তখন সেই সময়ে আমাদের দেশের নামকরা চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামানভাই ( তিনি কিন্ত ইউ, এস এ তে ফিল্মের উপর পড়ালেখা করেছেন, লস অ্যাঞ্জেলসে বেশ কিছু কাজও করেছেন) তিনি সদ্য বাংলাদেশে এসেছেন এবং কাজ শুরু করেছেন। তখন আমি রাশেদ জামান ভাইয়ের একটি বিজ্ঞাপনে সেলুলয়েড ক্যামেরায় একটি কাজে সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনিই আমাকে প্রথম সুযোগটি করে দিয়েছিলেন। এ জন্য রাশেদ ভাই ও অমিতাভ রেজার কাছে চির কৃতজ্ঞ…বিজ্ঞাপনের প্রজেক্টের ডিরেক্টর ছিলেন অমিতাভ রেজা।
তো রাশেদ জামান ভাইও কাজ করতে গিয়ে উপরের সেই প্রবলেমগুলো তিনিও লক্ষ্য করেছিলেন, একই রকম সমস্যার ্সম্মুক্ষিণ হয়েছিলেন। তখন তিনি আমাদের সঙ্গে এই বিষয়টি শেয়ার করেছিলেন। তিনি থার্টি ফাইভ মিলিমিটার ক্যামেরা কিনে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করার আশা ব্যক্ত ৃকরেছিলেন। যেখানে বিনা খরচে যেকোনো ব্যক্তি যাদের ক্যামেরার প্রতি আগ্রহ আছে এবং যারা এই সেক্টরে কাজ করছেন তাদেরকে সেলুলয়েড তথা থার্টি ফাইভ মিলিমিটার ক্যামেরা সম্পর্কে ধারণা দেয়ার উদ্দেশ্যে, ট্রেনিং দিয়ে আরো ক্যামেরা ক্রু, এসিস্টেন্ট এবং ক্যামেরাম্যান তৈরী হতে পারে।
এরপর রাশেদ জামান ভাইয়ের এই উদ্যোগ এবং পরিকল্পনার সাথে আমরা… চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা পিপলু আর খান, গোলাম হায়দার কিসলু,চিত্রগ্রাহক কামরুল হাসান খসরু, এবং আমি টি ডব্লিউ সৈনিক, রাশেদ জামানের এই পরিকল্পনা সাথে থাকি এবং একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি যার নাম স্যান্ডব্যাগ লিমিটেড। আমাদের এই কোম্পানির নামটিও দিয়েছিলেন রাশেদ জামান ভাই।
সেই সময় এই ২/৩ কোটি টাকা আমরা কোথায় পাবো…? এরপর আমরা এই কয়েক পাগল
এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে… আমরা কেউ আমাদের জমি বেঁচেছি, কষ্টে কেনা ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছি, কারো ক্রেডিট কার্ড ফাঁকা করে দিয়েছি, উচ্চসুদে লোন নিয়ে ক্যামেরা কেনা হয়।
এরপর শুরু হয় আমাদের স্বপ্নের স্যান্ডব্যাগ লিমিটেডের যাত্রা। আজ প্রায় এক যুগের বেশি হতে চললো স্যান্ড ব্যাগের বয়স। এখন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ ট্রেনিং পেয়ে প্রায় ২৮/৩০ জনের মত ক্যামেরা ক্রু, ফোকাস পুলার, স্টেডিক্যাম অপারেটর, ক্যামেরাম্যান, তৈরী হয়েছে এবং তারা সকলেই বাইরে সাফল্যের সহিত কাজ করে যাচ্ছে। এখনো ট্রেনিং পাচ্ছে অনেকে…এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এবং আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানসম্পন্ন স্মার্ট ক্যামেরার ক্রু তৈরি করা।
প্রশ্ন-১৬: কখন মনে হয় আটকে পড়ছেন; আসলে জানতে চাইছি কোন ব্যাপারটা ভালো লাগে না? হতে পারে মানুষের, হতে পারে রাষ্ট্রের, হতে পারে অন্য কিছু?
একটা জিনিস আমার খুব খারাপ লাগে আর তা হচ্ছে একটি মানুষ তার যেই কাজটি করার কথা সে, দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত, কিন্তু তার কাজটি সঠিকভাবে না করে অন্যের কাজে ইনভল্ভ হয়ে যান। এমনিতেই আমরা দুর্ভাগা জাতি। আবার অনেকেই আছেন বিভিন্ন জায়গায়… তারা কিসে ভালো, কিসে উন্নতিসম্ভব কি করলে সবচেয়ে বড় সমস্যা গুলো খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যেতে পারে তিনি সবকিছুই জানেন কিন্তু তিনি সেই কাজটি করতে পারেনা বা বলতেও পারেন না। এতে অনেক কস্টো হয়।
আরো ভাবতে কষ্ট হয়, খারাপ লাগে, এখন আমরা এক অদ্ভুত ধারণা নিয়ে জীবনযাপন করে যাচ্ছি। কোন কিছুতেই আমরা,আমাদের.. এই ভাবনাটা নেই। সবকিছুতেই আমি। আমিত্ব্য গ্রাস করেছে আমাদের……..কারো বিপদ বা কিছু হতে দেখলে আমরা সরে যাই এবং ভাবি আমার তো কিছু হয়নি। এ বিষয়গুলো আমার ভালো লাগেনা।
প্রশ্ন-১৭: আপনার সহকর্মী বন্ধুরা তো বলে আপনি খুব সজ্জন মানুষ; মিডিয়াতে নতুনদের জন্য এমন সজ্জন মানুষই সবাই চায়। আপনি যখন মিডিয়াতে যুক্ত হয়েছিলেন- অবস্থাটা কেমন ছিল আর এখন কেমন দেখছেন?
আমি আসলে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনেকরি। আমি যখন এই মিডিয়া জগতে প্রবেশ করি তখনকার কাজের পরিবেশ, মানুষগুলো, চারপাশে যারা ছিলেন সকলেই অত্যন্ত গুণী মেধাবী, বিনয়ী ছিলেন প্রত্যেকে প্রত্যেককে সন্মান করতেন পরিবেশটা ছিল আপন একেবারেই পরিবারের মতো সকলেই খুব কেয়ারিং ছিল প্রফেশনের প্রতি। কমিটমেন্ট রাখতো, সময়জ্ঞান ছিলো। মন দিয়ে মানুষের কাজ করার আগ্রহ ছিলো। তাই বলে এখন যে এসব অনুপস্থিত তা নয়। তবে বিরল, মনে করে খুজে বলতে হবে।
সেই সময়ের ওই মানুষগুলোর মত এখন আর তেমন পাওয়া যায় না যেমন গোলাম মোস্তফা স্যার আমজাদ হোসেন স্যার শেখ নিয়ামত আলী স্যার আল মামুন স্যার আরিফুল হক স্যার রওশন জামিল, আবুল খায়ের,সিডনি স্যার,হাসান ইমাম স্যার,লায়লা হাসান,ফেরদৌসী মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার,রওশান আরা, জামাল উদ্দীন হোসেন,সুবর্ণা মোস্তফা, শমী কায়সার,আফসানা মিমি সহ আরও অনেকেই… আমি
আবার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে আজকে যে একেবারে নতুন কাজ করছেন তাদের সাথও কাজ করছি। তাই অনেক পর্থক্য পাই।
সত্যিই বলতে হয়………..
“” আগের সকলেই ছিলো অত্যান্ত সজ্জন…”””
তাই আমর স্কুলিং সেই সময়ের বলে…..
“”” এখনকার নতুনদেকেও করে নিতে পারি আপন…”””
প্রশ্ন-১৮: একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন- আপনার সব থেকে আনন্দের কিংবা কষ্টের মুহূর্তটার কথা জানতে চাই। যা আপনাকে নিরেট আনন্দ বা দুঃখ দেয়।
স্রষ্টা আমাকে যতোগুলো বর দিয়েছিলেন, তার সবি যদি তুলে নেন…তাহলে আমি ভেবে নেবো আমি এসবের যোগ্য ছিলাম না। আমাকে তিনি সুযোগ দিয়েছিলেন, আমি তা কাজে লাগাতে পারেনি, মূল্যায়ন করেনি।। তাই আমি যোগ্য নই।
আমার বিশ্বাস তিনি আমাকে আমার যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান, কর্ম, স্বাস্থসহ জীবন ব্যাবস্থার সবকিছু মিলিয়ে…. আমার হায়াৎ অনুযায়ী জীবন যাপানের ব্যবস্থা নিশ্চই করে দেবেন।।।
প্রশ্ন-১৯: স্রষ্টা আপনাকে যতোগুলো বর দিয়েছেন, সবগুলো তুলে নিলে কী করবেন? কীভাবে কাটাবেন এই জীবন?
স্রষ্টা আমাকে যতোগুলো বর দিয়েছিলেন, তার সবি যদি তুলে নেন…তাহলে আমি ভেবে নেবো আমি এসবের যোগ্য ছিলাম না। আমাকে তিনি সুযোগ দিয়েছিলেন, আমি তা কাজে লাগাতে পারেনি, মূল্যায়ন করেনি।। তাই আমি যোগ্য নই।
আমার বিশ্বাস তিনি আমাকে আমার যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান, কর্ম, স্বাস্থসহ জীবন ব্যাবস্থার সবকিছু মিলিয়ে…. আমার হায়াৎ অনুযায়ী জীবন যাপানের ব্যবস্থা নিশ্চই করে দেবেন।।।
এলোমেলো আরো অনেক প্রশ্ন আছে বোকার। তার অনেক-ই এই লেখায় তুলছিনা। বোকা তার স্মৃতির মিনারে রেখে দিল। যদি আবারও সুযোগ ঘটে নিশ্চয়ই বোকা টি ডব্লিউ সৈনিকের সাথে আলাপ-আলোচনার আরেকটা দিক তুলে ধরবে অন্য কোনো লেখায়। বোকার অমন কাঠখোট্টা টাইপের প্রশ্নগুলোর কী দারুণ উত্তর দিয়েছেন টি ডব্লিউ সৈনিক। প্রিয় এই শিল্পীর জন্য নিরন্তর শুভ কামনা।

