কেহ কারো মন বোঝে না

নাসিমা আনিস নামটি বো-কাপা-ঠকদের অনেকেই হয়তো শুনে থাকবেন। না থাকলেও আমি নিশ্চিত- মোহিনীর থান এই নামটি নিশ্চয়ই শুনেছেন। মোহিনীর থান বাংলা সাহিত্যে একটি অনন্য সংযোজন। বোকা একে এক কথায় ‘অনবদ্য’ বলে প্রকাশ করে। 

বিরাট এক চ্যালেঞ্জ আর দায়িত্ব নিয়ে প্রিয় লেখক নাসিমা আনিস লিখেছেন এই উপন্যাস, মোহিনীর থান। যদিও বোকার আলোচনার বিষয় মোহিনীর থান নয়; তবুও আলোচনায় ঢুকবার জন্য একটা ইঙ্গিত তো লাগবেই। 

আজ বোকা তার জমিনে প্রকাশ করতে যাচ্ছে বিখ্যাত উপন্যাস মোহিনীর থানের লেখক নাসিমা আনিসের একটি অনন্য গল্প- কেহ কারো মন বোঝে না। তো বো-কাপা-ঠক আর দেরি নয়, চলো শুরু করি পাঠ…  

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

উনি দরোজায় বৃদ্ধ গন্ধরাজ গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কি যেন ভাবলেন তারপর বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে ভিতরে ঢুকলেন। আমি পুকুরের এপাশে আমার আস্তানা থেকে তাকে পরিষ্কার দেখতে পেলাম। রিক্সা তিনি মূল গেটের বাইরে রেখে কিছুটা পথ হেঁটে খুব কিছু ভাবনায় আছেন এমন ভঙ্গীতে বাড়ির দরোজায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হ্যাঁ আমি খেয়াল করেছি দরোজায় উনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। উনি আমার ঘরের দিকে তাকাননি, তাকাননি মানেই তিনি আমার আর আমার ঘরের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন! না তাকানোর ভান করে কী বোঝাতে চেয়েছেন! তোমার কথা আমি ভুলে গেছি! নাকি তোমার কথা আমি কখনো ভুলব না বলে ভোলার চেষ্টর অংশ হিসাবে তোমার কিংবা তোমার ঘরের দিকে তাকালামই না!

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

হ্যাঁ, হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট ছিল, কিংবা আরো কিছু হবে হয়ত। চমক দেখাতে তো তাঁর জুড়ি ভার! পৃথিবীতে কতক মানুষ থাকেন যারা শুধু চমক দেখিয়ে যান আর তার চমকের আলোয় কি আগুনে কে মরল কে বাঁচল সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ থাকে না। মিষ্টি হাতে দিয়ে তিনি হয়ত বলবেন তিনি একজন ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ কি এমপিকে বিয়ে করেছেন। মাকে ইনিয়েবিনিয়ে বলবেন, বুবু লোকটা খুব ভালো, আমায় এত ভালোবাসে! কোনোদিন ভালোবাসা পাইনি তো, পেলে খুব মন কাঁদে! মা পানের বাটা সামনে দিয়ে বলবেন, মঞ্জু পান খাও। মঞ্জু নামের অপূর্ব মহিলা পানের বাটা কাছে নিবে পান বানাবে কিন্তু খাবে না। 

Ñ ওমা তুমি পান খাওয়া ছাড়লা কবে! উনি জিবে কামড় দিয়ে বলবেন, ভুলে গেলেন? আপনার কাছে থাকতেই তো ছাড়ছি, উনি তো পান খাওয়া পছন্দ করতেন না! মা ভিতরে একটু ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে কি! পড়বে, স্বামীর ভাগ অন্য কেউ নিলেই যে পূর্বতন ছেড়ে দিয়েছেন সে কথা কোনো নারী বলতে পারেন না। মা দেখাতেন তার সময় কোথায় এ সব নিয়ে মাথা ঘামাবার। 

এত বড় সংসার! দূরদূরান্ত থেকে মক্কেলরা আসছে কঠিন কঠিন মামলা নিয়ে, বাদীবিবাদীরা স্বামী কি ছেলেকে বাঁচাতে জমিজিরাত বন্দক দিয়ে টাকাকড়ি নিয়ে এসেছে, মুখের দিকে তাকালেই তো বোঝা যায় কি নিরুপায়, আহা! তাদেরকে কি একটু সেবা দেয়া দরকার না! আরো আছে, উকিল বাড়িতে আশ্রিত ছাত্র, বেকার চাকরিচ্ছু, বিপদগ্রস্থ সাহায্যপ্রার্থী! সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করা বারণ, এটা বাবার হুকুম, মাও তাঁকে এ ব্যাপারে সদাসর্বদা সাহায্য করে গেছেন, দাদার আমলে একান্নবর্তী থাকতে যে সাতসেরি পিতলের হাড়িতে ভাত রাঁধা হতো, তখনো তা অব্যাহত ছিল। গেরস্থি অবশ্য নাই, গরুছাগল হাসমুরগি নাই। বাবা এসব দু’চোখে দেখতে পারতেন না।

নাসিমা আনিস
এর বইগুলোর প্রচ্ছদ গ্যালারিতে তুলে দেয়া হলো। 

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

আমরা তিনভাই, আমি মেজ, আমার ঘাড়ের একটি রগ ত্যাড়া, বাবা বেঁচে থাকতে মাকে বলতেন। কারণ বাবা ওনাকে বিয়ে করার পর আমি অন্দরমহল ছেড়ে বাইরের ঘরে আশ্রয় নেই, মাকে বলেছি বাড়ির কোনো ছায়া যদি আমার ঘরের আশপাশ দিয়ে হাঁটে তো আমি সব জ্বালিয়ে দিয়ে বাড়ি ছাড়ব। তখন আমি অনার্সে পড়ি, ফিলসফি আমার সাবজেক্ট, শহরের নাট্যদলে আমার যাতায়াত। বাড়িতে এত বারোয়ারি মানুষ আসে যায় থাকে, আমি এ সবে তাকাই না। 

বড়ভাই সহজ সরল মানুষ, খুব ভালো ছাত্র, বিদ্বান কি না জানি না, কিন্তু সে কিছু একটা করে দেখাবে, বাবার ধারনা ছিল। আর আমার প্রতি ছিল বাবার … কি যে ছিল কেমন করে বলি! বাবাকে নিয়ে বলা খুব মুস্কিল কিন্তু আমার ঢাকায় পড়তে না যাওয়া নিয়ে বিরক্ত থাকলেও কখনো মুখে কিছু বলতেন না। মাকে নাকি একবার বলেছিলেন, দেশ উদ্ধার করতে হলে ঢাকায় গিয়ে পড়তে হয়, বড় মানুষদের কাছ থেকে দেখতে হয়, তাদের সাথে মিশতে হয়। আমি আসলে দেশ উদ্ধার করতে চাইনি, মানুষকে সচেতন করার নেশা কেবল জেগেছিল একটা সময়। 

আর তিনি মানে যাকে দিয়ে প্রথম বাক্য শুরু করেছিলাম, স্বামীকে উদ্ধার করতে এলেন বহু খালবিলনদীনালা পাড়ি দিয়ে বামনা থেকে এই বরিশাল সদরে। এসেছেন ডাকাত স্বামীকে বাঁচাতে! আশ্চর্য! ডাকাত স্বামীকে বাঁচাতে কেউ উকিলবাড়ি পড়ে থাকেন! আসলেন তো আসলেনই, আর গেলেন না। মায়ের হাতের কাজটা কেড়ে নিয়ে করে ফেলেন, বিশে পঞ্চাশে মানুষের রান্না করে ফেলেন চোখের পলকে। বাড়িতে তিন তিনটা কাজের লোক। মা যত নিষেধ করেন তিনি তত কাজে উঠে পড়ে লাগেন। মা তাঁর তরকারির গুণ গাইতে গাইতে বলেন, আহা স্বামীকে বাঁচাতে তার কত চেষ্টা, হোক সে চোর কি ডাকাত! মানুষ কি এমনি এমনি চোরডাকাত হয় নাকি! আর যদি হয়েই যায় তো তাকে বাঁচাতে স্ত্রী প্রাণপাত চেষ্টা করবে না! কে জানে ছাড়া পেলে সেও একদিন দামি কাজ করে সবাইকে সাহায্য করতে পারে, কত ডাকাতের গল্প শুনেছি এমন! মা এমন করেই ভাবতেন।

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

তখন দোতলার চিলেকোঠায় আমার ঘর। বাবার অফিস ঘর নিচে একেবারে বাড়িতে ঢুকতেই। বড় বড় আলমারি মোটা মোটা বই, দু’একজন সহকারী আর নানাপদের লোক। বাবার সাথে আমার দেখা হয় অনেক রাতে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, বাবা ফাইলে মুখ গুজে বসে আছেন, মুখ তুললে দেখি চোখেমুখে রাজ্যির বিরক্তমাখা দুশ্চিন্তা। বাবার ঘর দিয়েই রাতে ঢুকতে হয়, সদর দরোজা বন্ধ হয়ে যায় এশার আজানের সাথে সাথে। 

কুকুরগুলো বাবার দরোজার বাইরে বসে হল্লা করে আর বাবা মাঝে মাঝে গিয়ে ওদের সাথে কি কথা যেন বলে আসেন, ওরা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকে।  ছোটবেলায় কোনো কোনো দিন বাবা ছাদে এসে বন্দুক ফুটাতেন, বাবাকে তখন দারুণ লাগত। বলতেন কোনো চোর ডাকাতের সাহস নাই এ বাড়িতে ঢোকে… হা হা হা। বাবা যখন হাসতেন, কচি কদবেল গাছটা পর্যন্ত তিরতির করে কাঁপত। বাবা একদিন বলেছিলেন, যুদ্ধে যাওয়া উচিত ছিল, কেন যে পালিয়ে বেড়ালাম মাকে নিয়ে!

ভাইয়া ততক্ষনাৎ বাবাকে খুশি করে দিত, তুমি না তোমার মায়ের অন্ধের যষ্ঠি! বাবা আবারও হাসতেন। আমি বাবার এই ডিফেন্স পছন্দ করতাম না। মায়ের উপর দোষ কেন দিচ্ছ! যেতে চাইলে কে ঠেকাত!

একটা ঘটনা ঘটে তখন। শাড়ি পরা এই নারী ঘোরে ছাদে, ছাদ একেবারে আমার এলাকা ছিল এতদিন। মা কোনো দিন ছাদে ওঠেন না অথচ দেখি তিনি ছাদে আসেন, আচার কুল কিংবা অন্য কিছু নিয়ে। ছাদের আলিশাতে উপুর হয়ে কি যেন দেখেন নিচে আর তার পিঠের কাপড় সরে যায়। আমার পড়ার টেবিল বরাবর, বুড়ো কতবেল গাছের ছায়ায়, গাছে মানুষের মাথার সমান কতবেল Ñ প্রথম দেখায় লোকে বোকা হয়ে যায় এত বড়ো কদবেল! 

আমি একদিন বোকা হলাম। প্রথমে মনে হত, গাছের ছায়া বলে ওখানে দাঁড়ান, পরে আমার পিঠশিরদাড়া শিরশির করে। মাখনের মতো ঘাড় আর পিঠ উপচে ঝলমলে আলো পিছলে পড়ে, ব্লাউজের উপরের কি নিচের অংশ বেয়ে। এরপর আরো কয়েকদিন। আমার কামভাব জাগ্রত হয়, দমন করতে কষ্ট হয়। তারপর আর আসেন না। তিনি যে বাড়িতেই আছেন তা টের পাই মাঝে মাঝে আচার কি আমসত্ত্ব শুকাতে দেখে কিংবা মা হয়ত বলছেন, তরকারি আজকাল মঞ্জুরানি রান্ধে, ভালোই রান্ধে। আমি বুঝি, বটে, তার নাম রানি! রানির মতোই রুপ। কিন্তু ডাকাত তো শুনেছি খুব বিখ্যাত, তার বউটার বয়স এত কম কেন! নিশ্চয় সে এক অন্য গল্প!

মঞ্জুরানি নাকি এ বাড়িতে ছোটবেলা আসতেন, মায়ের কেমন লতায় পাতায় বোন হন তিনি। বাবার সাথে শহরে আসতেন কোনো কাজে। কিন্তু এ যাত্রা তিনি বোনের পরিচয়ে আসেননি, এসেছেন স্বামীর মামলা চালাতে, যাবজ্জীবন কি ফাঁসি থেকে বাঁচাতে।

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

এরশাদ হঠাও আন্দোলনে সারাদেশ তোলপাড়। এই শহরও বেশ গরম তখন। জানি, বাবা সব সময় যে দিকে মেঘ সে দিকে পাথলা দিয়ে চলেন। আর পটপরিবর্তন হলে কোর্টে এর একটা প্রভাব তো পড়েই। তবু আমি জানি রানির কেসটা বাবা অনেক কিছু করতে পারেন। চেষ্টা করলে সাজা কমিয়ে এমনকি বেকসুর খালাসও করিয়ে ফেলতে পারেন। আমার বিশ^াস বাবা যা পারবেন এই শহরের কোন উকিল তার চেয়ে বেশি পারবেন না। মা খাবার দিয়ে রানিকে জেলহাজতে পাঠান খুনি স্বামীকে দেখতে। মায়ের দয়াশীলতার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই তো দেখে আসছি, এ আর এমন কি!

 দেখতে দেখতে তিন মাস হয়ে গেল রানির এখানে থাকার। ভরা বর্ষায় এসেছেন, এখন শীত প্রায়। ঠা-া হাওয়াটা রাতে জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকলে কি যে মনে আসে, কি যে মন চায়। কদবেলহীন গাছে নতুন কিশলয় দেখা দেয় কি দেয় না, জোৎ¯œাহীন রাত দোল দেয়। ছাদের আলিশাতে বসে থাকি দূরে একটা খর¯্রােতা নদী কল্পনায় আন্দাজ করি, এঁকেবেঁকে চলে গেছে। আসলে তো গভীর অন্ধকার। আলিশাতে হাত বুলাই এই জায়গায় রানি দাঁড়াত, ধনুকের মতো টানটান পিঠ, এখন দাঁড়ায় না। বাড়িতে নড়াচড়া বুঝতে পারি, সামনে যাই না, এড়িয়ে চলি। একরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি, চোখটা নিচে যায়, ছায়া দুটো, বাবার জানালায় জড়াজড়ি করছে…। মনে মনে বলি বাতি নিভাও না কেন! নিভাও নিভাও!

না বাবা সামান্য ডাকাতটার জন্য বিশেষ কিছু করতে পারেন নাই। আরো ছয়মাস কেসের কোন সংবাদ আমরা জানতাম না। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু খুঁজি Ñ পাই না। সংসার তৃপ্ত এক মহিলা বিশাল সংসার আঁকড়ে দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন। আমি রানিকে তার দেশে পাঠিয়ে দিতে বললে মা অত্যন্ত রুষ্ঠ হন। শেষে বাবাকেই বলি বাড়ি ভর্তি করে তোমার মক্কেলরা যদি ঘুরে বেড়ায় সেটা তোমার ছেলেমেয়েদের জন্য খারাপ। বাবা হঠাৎ আমার এই কথায় কি বুঝলেন জানি না। 

বললেন তোমার মাকে বল, সব তাড়িয়ে বাড়ি হালকা করুক। আমার মা খুব বড়ো বাড়ির মেয়ে ছিলেন, সে কারণেই সম্ভবত মা দানধ্যান করে তাঁর পরিচয় দিতেন। সে সময় আমার দলের কাজে কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় আসতে হয়, দল নিয়ে পথনাটক করে বেড়াই, বাড়ির কথা ভুলেই যাই ্্এক রকম। ফিরে গিয়ে দেখি বাড়িতে রানি নাই, রানির স্বামীর যাবজ্জীবন হয়েছে এবং কেসটা এখন ঢাকায় উচ্চ আদালতে মুভ করবে। বাবাকে দেখি বাড়িতেই বেশি থাকেন, একটু আনমনা দেখায়। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাবাকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে হয়ত, নাকি তিনি একটু ধীর চল নীতি নিলেন জানি না।

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

কেস নিয়ে ঢাকায় যাওয়া বাবার পুরানো ব্যাপার। এবার দেখি সঙ্গে মঞ্জুরানি যায়। রাতের স্টিমারে কেবিন ভাড়া করে তারা যাতায়াত করেন। একদিন শুনি তিনি কিছুদিন ঢাকায় থাকবেন মামলারই কাজে। মাস খানেক পর বাবা একা ফিরলেন আর মা পরদিন খুব জ¦রে পড়লেন। রানির ডাকাত স্বামীর যাবজ্জীবন বহাল রইল, আমরা যেন জানতাম এই খবরই আসবে, বাবা ওর জন্য কিছু করবেন না।

 সংসার অচল হওয়ার দশা, রানি এলেন, রানির বেশে। মায়ের জ¦রের কারণ বুঝলাম। আশ্চর্য, বাড়িতে একটুও চিৎকার চেঁচামেচি হলো না। মা নিজের ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন। আমি বাড়ি ছেড়ে পুকুর পাড়ের পরিত্যক্ত বাংলা ঘরটায় উঠলাম। এখানেই আমার খাবার আসে, আমি বাড়ি যাই না।

একটা কথা আজ খুব মনে পড়ছে। একদিন দুপুরে খুব ঝড়জল হলো তারপর বাড়িতে একটা কালো জিপ এলে মা আর উনি দুজনে কোথায় জানি গেলেন। পরে শুনেছিলাম তিনি মাকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর নিজের লাইগেশান করাতে। মা সাক্ষ্য দিবেন তার তিন ছেলে আছে আর সন্তান চাই না।

বছর তিনেক তাঁরা দুই সতীনে সংসার করলেন, বাবা স্ট্রোক করে নিচের অফিস ঘরে মারা গেলেন অল্প বয়সে, পঞ্চাশ হয়েছে কি হয় নাই। তিনি বাবা মারা যাবার পর অল্প কিছুদিন ছিলেন। মা তাকে খুব ভালোবাসতেন, বস্তুত মায়ের ভালোবাসা ছিল অপার। এমন কি বাবা ওনাকে সিনেমায় নিয়ে যান না বলে মা সঙ্গে করে সিনেমা দেখতে নিয়ে যেতেন বাবা বেঁচে থাকতেই। নূপুর কিনে দিয়েছিলেন ওকে, আমাদের কোনো বোন ছিল না, সেটা কোনো কারণ কিনা জানি না। বিয়ের পর যতদিন এ বাড়িতে ছিলেন কোনো দিন আমার সামনে আসেননি কিন্তু আমার সব সময় মনে হতো তিনি আমাকে লক্ষ্য করতেন দূর থেকে। উপযাজক হয়ে সেবা দেয়ার কোনো চেষ্টা করেননি, এটার কারণে তার প্রতি আমার অনুরাগ অব্যাহত ছিল হয়তো। আর আমি পারতপক্ষে বাবার মুখোমুখি হতাম না। আমি পড়া ছেড়ে দিলাম, নাটক ছেড়ে দিলাম আর শুধু দু’একটা মাত্র জিনিস ছাড়তে পারলে আমি বরিশাল ছাড়তে পারতাম সে সময়, সে নদী কীর্তনখোলা, লঞ্চঘাট আর জেলখানার গরাদ। আমি রোজ ঘাটে যেতাম আর মুখচেনা নাচেনা মানুষদের দেখতাম। মনে হতো নাটক দেখছি Ñ সত্যিজীবন, কোনো অভিনয় নাই। যদিও জানি দু’চারজন ভিক্ষুক আছে যারা একই জিনিস রোজ করে, একইভাবে হাত পাতে, একই গদ আওড়ায়।

 জেলখানার সবাই জানত আমি তার কাছের আত্মীয়, তিনি আমায় বাবা বলতেন, এই ডাকটা আমি ফিরিয়েছি, বলেছি আমি অন্তু, অন্তু বলেন। আর আমি আসি আমার এক নিকট আত্মীয়কে দেখতে, আপনাকেও তাই একটু দেখে যাই। জানি উনি বিশ^াস করতেন না। উনি মোটেই বোকা নন। আমি তিন বছর প্রতি সপ্তাহে গেছি, কখনো সপ্তাহে দুইতিন দিনও। ভয়াবহ এক অস্থিরতা আমাকে তাড়া করত, আমি ছুটে যেতাম।

হ্যাঁ তিনি আমাদের বাড়ি ছাড়ার পর একজন ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন, মায়ের মুখে শোনা। তিনিও মারা যান কিন্তু সেখান থেকে তিনি একটি আশ্রয় পান, একটা বাড়ি। মায়ের ওর প্রতি সব সময় সম্ভ্রমাত্বক আচরণ ছিল, যেন তিনি ওনার সতীন, তার একটা মর্যদাপূর্ণ আসন থাকা চাই এ বাড়িতে। আমিই সবচেয়ে বিরক্ত ছিলাম বাবার স্ত্রী হিসেবে তাকে পেয়ে কিন্তু মা সব সময় বলতে চাইতেন সম্মান না কর অসম্মান তুমি ওকে করতে পারো না।

কেহ কারো মন বোঝে না: নাসিমা আনিস

ঘণ্টাখানেক পর তিনি চলে গেলেন। আমার কেন জানি একটা অন্য রকম অনুভূতি হলো এবার, আমি প্রায় ছয় মাস জেলখানায় যাই না। যাই না মানে তাকে আমি ভুলে গেছি তা না। আমাকে এত অষুধ খেতে হয় যে আমি বাড়িতেই সারাদিনরাত ঘুমাই। আমার পক্ষে একা জেলখানা পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব না। আর আমি যে ওনাকে দেখতে যাই সেটা কাউকে বলাও আমার পছন্দ না। সংসার এই কয় বছরে অনেক বদলে গেছে। বাড়ি নিরিবিলি, পুরো বাড়িতে মা আর আমি, ফুলুখালা রান্না করে দেয়, মায়ের সঙ্গে থাকে। ভাইরা দুজনেই ঢাকায়, ওদের জীবন বদলেছে। আমি শুধু পনের/বিশ বছর আগের জীবনে রয়ে গেছি।

কি জানি কি ভেবে ভিতর বাড়ি গেলাম, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তো যাই। শুনি, মা ফালুখালাকে বলছেন, আজ একটু ভালো কিছু রান্না কর। আজ খুশির দিন।

 দেখি টেবিলের উপর রানির আনা মিষ্টির প্যাকেট।

 সারাদিন অস্থির লাগে। সন্ধ্যায় কীর্তনখোলার পাড়ে গিয়ে বসে থাকি। ঝড়জল হতে পারে, আকাশ লাল আর ঘোলা। নদী নারীর মত দিনেদুপুরে সন্ধ্যায় কি রাতে কত যে তার রুপ! বুঝতে পারি সে সময়েরই কারণে। আজ তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, রানি নিজে তাকে আনতে গেছে। আচ্ছা, রানির আজকে এ বাড়িতে আসতে ইচ্ছা হলো কেন! জেল থেকে বেরুনো লোকটার বয়স কত? ষাট সত্তর? আমি হিসাব করি নিজের বয়স, বাবা কী এই বয়সে চলে গেছিলেন? কিছু মাত্র অষুধ কি সেবা না নিয়ে…।

কীর্তনখোলা আজ ভয়াবহ, নদীনালার দেশের মানুষ আমি সাঁতার ভুলে গেছি। সাঁতার জানা মানুষ সাঁতার  ভোলে নাÑ লোকে বলে। লোকে কত ভুল জিনিস যে জানে!

-সমাপ্ত-

নাসিমা আনিস, উপন্যাসিক, তৃতীয় লিঙ্গ, বাংলাগদ্য, ঢাকা, বাংলা, গদ্য, পদ্য, কবিতা, সাহিত্য, কলকাতা, ঢাকা

লেখক নাসিমা আনিস ১৬ নভেম্বর ১৯৬২ সালে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, ইডেন কলেজ থেকে এইচএসসি, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক এবং চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর অর্জন করেন। 

পেশা হিসাবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে।

গুণী এই লেখকের প্রথম গ্রন্থ ‘মোহিনীর থান’। তার প্রকাশিত গ্রন্থ ১৫টি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top