ভোরের বাতাসে শস্যের ঘ্রাণ, বাংলা, কবিতা, ঢাকা, গদ্য, পদ্য, মারেকা ফেরদৌস, কলকাতা, বনশ্রী, বনানী, তরু, বৃক্ষপত্র

ভোরের বাতাসে শস্যের ঘ্রাণ

Spread the love
Reading Time: 14 minutes

বোকা তার শৈশব থেকেই মালেকা ফেরদৌসের নাম শুনে আসছে। তার কাব্যের সাথেও পরিচিত এই বোকা। সারল্যে ভরা শব্দের-মালা গাঁথেন কবি মালেকা ফেরদৌস। বোকা সেই মালার সুগন্ধ বিলিয়ে দিতে চেয়েছে আপামর বো-কাপা-ঠকদের। 

বোকা বিনয়ের ধার ধারে না। বোকা বিনয়কে আসক্তি বলে। কবিতায় বিনয় থাকলে মালেকা ফেরদৌসের কবিতাতেই তার অস্তিত্ব আছে। কবি মালেকা ফেরদৌসের কবিতার শব্দগুলো ততোটাই বিনয়ী যতোটা একটা মানুষকে মানুষ করে তুলতে সহায়ক হয়ে উঠে। মানুষ তার নিগূঢ় গহীন নিঃশ্বাসটিও টের পেতে পারে। তাই কবি কবিতার ফ্রেমে সদা বিনয়ী। কতো কঠিন বাস্তবতাকে বিনয় দিয়ে মানুষের চিন্তার মধ্যে নিয়ে আসেন। বোকা তো একটা স্যালুট দিতে পারে, স্যালুট হে প্রিয় কবি!

কবি মালেকা ফেরদৌসের কবিতায় বিনয়ের মাত্রাটা কেমন? এই যেমন- “ভোরের বাতাসে শস্যের ঘ্রাণ!” কী দারুণ নির্মাণ! কী সহজ শব্দের খেলা। চিরচেনা দৃশ্যপট, চির আপন! এ কেবল মালেকা ফেরদৌসের কবিতাতেই মেলে। 

বোকার অনুরোধে, প্রিয় কবি মালেকা ফেরদৌস ১০টি কবিতা বো-কাপা-ঠকদের পড়তে দিয়েছেন। কবিতাগুলো বোকা প্রকাশ করতে পেরে গর্বিত।

-বোকা

বিচার-প্রার্থী একজন শাহেরা। যিনি জনে জনে ঘুষ দিতে দিতে ক্লান্ত, নিঃশ্ব। যিনি গতকাল বিচারপতির এজলাসে টাকা ছুঁড়ে প্রতিবাদ করেছেন। সেই প্রতিবাদী পাগল নারীকে নিয়ে...

বৃক্ষপত্র
মালেকা ফেরদৌস

অবশেষে একপাল নেকড়ে আর কাঁটা গুল্মের পথ
পেছনে ফেলে একজন নারী
ঠিক বিচারকের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
মানুষের মত দেখতে কিছু প্রাণী
কাগজের মধ্যে ডুবে আছে শব্দহীন,
একটা দুর্দশাগ্রস্ত কক্ষে ভাঙ্গা মূর্তির মত
বিচারক বসে আছেন,বাইরের কোলাহলে
পুরনো সিঁড়িঘরের কিছু পাখি দিগ্বিদিক উড়ছে…
হঠাৎ ভাঙ্গা তৈজসপত্রের মত ঝনঝনিয়ে
বেজে উঠলো সেই নারীর কন্ঠ-
‘টাকা কি তবে বৃক্ষপত্র? হে ধর্মাবতার ! এই নিন…..
আমি বৃক্ষপত্র তুলতে তুলতে ভীষণ ক্লান্ত!
সাধ্য থাকলে তাবত বৃক্ষের পত্রই দিয়ে যেতাম।
আশপাশের খচ্চর গুলো কৌতুহলী হয়ে উঠলো
রাজার সিপাই পাগলীর কন্ঠস্বরকে অবরুদ্ধ
করতে চঞ্চল হয়ে উঠলো..
একটা বিশাল খাঁচায় বিচারক
লাল পাখি হয়ে উড়বার জন্য পাখা মেললো !

নিজের ভেতরে
মালেকা ফেরদৌস

ফুলের গন্ধ ঝরে হেমন্তের শিশির জলে
ভোরের বাতাসে শস্যের ঘ্রাণ- এখনও
পাকা ধানের নেশা ছড়ায় চারদিকে হীম হীম
মৃত্যুর খবরও ছড়িয়ে পড়ে মাঝে মাঝে,
আপনার কথা মনে হলেই যেন পাখায় পালক গজায় আমার
ভাবতে থাকি কোথা থেকে শুরু করি ,
ফুল পাখিদের শুধাই,আকাশের সাথে কথা বলি
মেঘ দেখলে নিজের ভেতরেই বৃষ্টির শব্দ শুনি!
সেই কবে- আল্লামা ইকবালের দুটো লাইন
মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছেন,বিশ্বাস করুন আজও সরাতে পারিনি।
“বিলাপ তুলেছে বুলবুলি ঐ ব্যাথায় তাহার জ্বলিছে বুক
আমিতো গোলাপ নহি যে বন্ধু শুনে যাব আর রহিব মুক।”
কবিতাকে বিশ্বাস করোনা অথচ-
রক্তের ভেতরেই কবিতারা ঢেউ তোলে।

যদি বৃক্ষ হতাম
মালেকা ফেরদৌস

ভোরের বাতাসে শস্যের ঘ্রাণ, ঢাকা, বাংলাদেশ, কবিতা, মহিলা কবি, কলকাতা, গদ্য, পদ্য, কীর্তনখোলা, সাহিত্য, আড্ডা

আমি যতবার পাহাড়ে যাই
সরল বৃক্ষদের দেখে বিস্মিত হই,
স্মৃতিসৌধের মত সুচালো শিরোদেশ,
বাতাসে সুরের ব্যঞ্জনায় দুলতে থাকে,
তাদের হৃদয়ের সবুজ উপাখ্যান
আর নক্ষত্রের গল্প শুনি।
স্বাদু জল ও ক্রমবিকশিত বৃক্ষদের
দেখি, পাহাড় অতিক্রমের কি অদম্য সাহস!
আমার রক্তে নগরের কোলাহল তবুও
নিজেকে মনে হয় পরিযায়ী পাখি,
রেশম কোমল কুয়াশা, মেঘের মত
পাতাগুলো আমার ভাবনার তরঙ্গে
নাড়া দেয়, তখন আমার অবলোকন
আইসিসের চোখের চেয়েও বিস্তৃত মনে হয়।
আহা! আমি যদি বৃক্ষ হতাম !

আমি এই “চিড়িয়াখানা”র পক্ষপাতি না। আমি ওইদিন পর্যন্ত জানতাম এবং ভাবতে চাইতাম- বিলুপ্তপ্রায় কিংবা নানাভাবে আক্রান্ত প্রাণীদের সংরক্ষণ রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানুষ এবং অপরাপর প্রাণীর মেলবন্ধন ঘটাবার জন্যই গড়া হয় ZOO নামক অভয়ারণ্য কিংবা “প্রাণযোগ কেন্দ্র”। কিন্তু ঢাকায় সত্যিকারার্থেই চিড়িয়াখানা রয়েছে। যেখানে মানুষ ছাড়া পৃথিবীর আর সব প্রাণ হইলো চিড়িয়া। তুমি তাকে মারো কাট যা খুশি তা করো- কোন প্রাণ তোমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। কারণ তুমি মানুষ আর ও চিড়িয়া।আর তাই আমার দিকে নিবিষ্ট ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকা বানরটা দেখে বেশ থতমতই খেলাম। কারণ তার দুটি পা-ই ভাঙা। সে কোনোমতে টেনে টেন এধার থেকে ও ধারে যাচ্ছে। ওর চোখে মৃত্যুছায়া, যন্ত্রণা। একরাশ দুঃসহ হাতাশা। আর আছে তীব্রঘৃণা। এই চিড়িয়াখানার মানে কি? আমি জানি না। যেখানে নীরবতার বদলে মানুষের হট্টগোলে ভয়ানক ভয়ে রাজ-সিংহটাও।

ফিলিস্তিন
মালেকা ফেরদৌস

দীর্ঘ বিস্তারি ক্লান্ত এক পথের নাম ফিলিস্তিন!
বাতাসে বারুদ,আগুন আর ইন্তিফাদার নাম
ফিলিস্তিন,

বেদনা,প্রতিবাদ ,গুলি আর রক্তের ভেতর
কলোরোলের নাম ফিলিস্তিন,

জাতি হত্যার দুঃখ বিধুর পান্ডুলিপির নাম ফিলিস্তিন,
স্বাধীনতা লড়াইয়ের জীর্ণ ইতিহাসের নাম ফিলিস্তিন,
জাহেলিয়ার গহ্বর থেকে মুক্ত আকাশ দেখতে
চাওয়ার নাম ফিলিস্তিন,
নীল মসজিদে সিজদার লড়াইয়ের নাম ফিলিস্তিন!

বিনীত জীবন
মালেকা ফেরদৌস

প্রান্তরে দাঁড়ানো একটি গাছ,তার শরীর ছুঁয়ে
নিরিবিলি ঝরে যায় মধ্যদিনের রোদ,রাতের জ্যোৎস্না,
জলপাই রং বৃষ্টির জল,পাখির শোরগোল
স্নিগ্ধ সজল গভীর সবুজ পাতায়।
পূর্নিমায় রূপালী রেখার মত নদী শব্দের ঢেউ তুলে
ভেঙ্গে পড়ে আমার জানালায়,
স্মৃতির দর্পনে ভাসে বিচিত্র শস্যের মাঠ,
নিরন্তর ধানক্ষেত,অনন্ত প্রবাহী মেঘনা,
বৃক্ষের বিষাদমাখা ছায়ায় একটি কিশোর মুখ;
বিষাদের গ্রন্থিখুলে মিহিন কষ্টেরা জাগে চৈতন্যের অতল অবধি।
তবুও জীবনের জটিল ক্যানভাসে
প্রত্যাহ  স্বপ্নের রেখা টানি, রেখে দেই বিনীত এ জীবন।

চিঠি দিও
মালেকা ফেরদৌস

চিঠি দিও- গভীর সজল
আকাশের মত,বৃষ্টির সৌগন্ধ্য মাখা
সবুজ নদীর মত প্রশান্ত প্রবাহে
পাখির ডানার মত মেলে দেয়া ঢেউয়ে
দুপুরের রোদ আকুল উত্তাপে
নিমজ্জিত বিপুল ঐশ্বর্যের সবটুকু দিও,
বিকশিত গোলাপের মত
প্রতিটি পাতায় ভেজা সবুজের
বিস্তারিত বৃক্ষের সুবাস পাঠিও।

চিঠি দিও- কিছু ফুল ফোটার
সবিস্তার বর্ননা চাই আমি
নদী ও নিসর্গের অন্তরঙ্গ সংলাপের ছবি
দিও তোমার সুশৃঙ্খল শব্দের ভেতর
যাযাবর পাখিদের কলরোল,দিও
গাঁয়ের মসজিদের ভোরের আযান।
পলিময় আদ্র মৃত্তিকায় বেড়ে ওঠা
শস্যের নাম লিখে দিও-
বর্ণের বিবরণ জানি আমি।
নীল প্রজাপতি,ঘাস ফড়িং
শাদা খাম ভরে দিও, -লিখে দিও
চেনা – অচেনা অসংখ্য  নাম।

কৌতুহলী মানুষ
মালেকা ফেরদৌস

অনেক কাল চলে গেছে ,
এই লোকালয়ের মানুষ এখন সত্যকে নিয়ে
কোন জনশ্রুতি পর্যন্ত শোনেনা,মিথ্যাই যেন রীতি।
হারিয়ে যাওয়া সন্তান খুঁজতে গিয়ে মা ভাবে-
তাহলে ওরা নিজেরাই হাওয়ায় মেলালো!
অশ্রুজলের ভেতর থেকে দেখে, জেলের দরোজায় মৃত সন্তানের লাশ!
লোকালয়ের হারিয়ে যাওয়া হে মানুষেরা – আমার সন্তানেরা,
আমি তোমাদের ভালোবাসি!
কারণ জালেমের মুখোমুখি তোমরা ভীষণ দূর্বল।
ন্যায়বিচারের অতিকায় দুটো হাত দেখ,-
তোমাদের হত্যাকারীকে অভয় দিচ্ছে আর
শয়তানের জলসায় জালেমের নাচ দেখতে যাচ্ছে
নগরের কিছু কৌতুহলী মানুষ!

বিষাদগ্রস্তরা জেগে ওঠো
মালেকা ফেরদৌস

সমুদ্রের মত গভীর বিস্তৃত
শীতার্ত ভোর- বাতাবী ফুলের কোমল গন্ধ
হৃদয়ে নিবেদিত প্রার্থনার মত
বিহ্বল বাতাস কোলাহল তোলে জানালায়,
অনন্তকালের ভেতর প্রবাহিত সৌন্দর্যের
নদী ফিসফিসিয়ে বলে-বসন্ত এসেছে!
তখনও পুষ্পিত পাখির মত হলুদ পাতা ঝরছিল
পরিযায়ী পাখিরা ফিরে যাচ্ছে ঘরে।
এসো আমরাও বেরিয়ে পরি-
ফুলের পেয়ালায় পান করি
নৈঃশ্দের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা
সব বিষাদগ্রস্তরা জেগে উঠো
এসো আমরা নাইটিংগেলের মত সুর তুলি।

ক্যাফের বেড়াল
মালেকা ফেরদৌস

ক্যাফের বেড়ালেরা চুপচাপ বাড়ি ফিরছে
শুনশান শব্দহীন পরান্নাভোজী এসব পোষা বেড়াল
দানব মালিকের জুতা চেটে সাফ করে
অনর্গল মিথ্যা মিউ মিউ শব্দে প্রভুকে ব্যস্ত রাখে,
আসলে এসব বেড়ালেরাই প্রকৃত বিশ্বাসঘাতক।

আকাশে ক্রিসেন্ট চাঁদ পুলের জলে দুলছে,
জোনাকিরা ক্লান্তিহীন চক্রাকারে ঝোপের চারদিকে-
সচলতার এই ঘুর্ণ্যমান বৃত্ত রাতের আধাঁর ভেঙ্গে চৌচির
করে দেবে, প্রকৃতি যেন এই স্থুল সময়ে সব অতিক্রমের সাহস দেবে।

বিরুদ্ধ বাতাস ক্রমশঃ পৃথিবীর মানুষকে একা করছে
আমরা সুবিধা বঞ্চিত নিম্নবিত্ত দরিদ্ররা কেবল আকাশে তাকাই-
আগের মত পৃথিবী আবার জেগে উঠুক,সবুজ পাতার আঘ্রাণ
বাতাসের তরঙ্গে আবার প্রবাহিত হোক, ভয়হীন জনপদে
কলরোল উঠুক নতুন পৃথিবীর মানুষের পদযাত্রায়।

অলৌকিক পাখা
মালেকা ফেরদৌস

খুব কম হাসতে দেখেছি তাকে, সব কিছু ছিল
পরিমিত। ইতিহাস, ধর্ম,সাহিত্য কিংবা কবিতার
কোন লাইন শোনাতে গেলে- কোন ভরসা ছিলনা
যে তিনি অপছন্দের বিষয়ে প্রতিবাদ করবেন না।
যুক্তি আর মনি মুক্তার মত এমন  শব্দের ব্যবহার
উপহার দিতেন,মনে হত এ শব্দগুলোর সব কিছুই
শুধু আমার জন্য।তিনি বলতেন জানোতো কবিরা
আকাশে ওড়ে,অলৌকিক পাখা আছে তাদের! তার
কথা শুনে কখনো অবাক হতাম না।একবার
সেই অলৌকিক পাখার গল্প তাকে বানিয়ে বানিয়ে
বলেছিলাম, ভীষণ আগ্রহভরে শুনলেন এবং
হেসে বললেন- বাহ্ ! দারুণ কথা বলতে শিখেছো তো!

কবি মালেকা ফেরদৌস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষাও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর অর্জন করেন। বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখা তার লেখা আলো ছড়াচ্ছে।

বরিশালে থেকে প্রকাশিত ‘বরিশাল দর্পন’এ ১৯৬৯ সালে মালেকা ফেরদৌসের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। মজার ব্যাপার হলো তখন তিনি কেবল ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্রী।

তার পিতা প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক মোঃ ইয়াকুব আলী এবং মা রাজিয়া বেগম।

কবি মালেকা ফেরদৌসের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে, শব্দ বর্ণ কোলাহল, এই অমৃত এই বিষ, নীল খাম, কবিতা সমগ্র, আশ্চর্য অধীর তুমি, পাখির মতো বৃষ্টিরা উড়ে যায়, স্বদেশ, প্রকৃতিও প্রেমের কবিতা ইত্যাদি।

কবি এখনও নিরলস লিখে চলেছেন। কবির জন্য অশেষ শ্রদ্ধা ও শুভ কামনা! 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *