বিস্ময়কর সবকিছু

বিস্ময়কর সবকিছু এবং একটি পর্যবেক্ষণ

Spread the love
Reading Time: 19 minutes

প্রিয় বো-কাপা-ঠক, সৈয়দ জামিল আহমেদের নাটক বিস্ময়কর সবকিছু নিয়ে নানা জনের নানান প্রতিক্রিয়া পেয়েছে বোকা। বোকা সাগ্রহে সেসব প্রকাশ করতে চেয়েছে। বিস্তারিত একটা আলাপ-আলোচনার অপেক্ষা করছিল বোকা। একটু দেরিতে হলেও বোকা প্রকাশ করলো বিস্ময়কর সবকিছু নাটকের একটি প্রতিক্রিয়া। -বোকা

ব্রাজিলিয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি ‘নিপীড়িতের শিক্ষা’ (Pedagogy the Oppressed)’ নামে যুগান্তকারী একটি বই প্রকাশ করেন ১৯৬৮-তে। বইটিতে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য স্বশিখন প্রক্রিয়া ও জাগরণ কেমন করে হবে সেসব বিষয় পদ্ধতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেন, পাওলো ফ্রেইরি। এই লেখকে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত হয়ে অগাস্ট বো’ল ১৯৭০ সালে নাট্যধারায় ‘নিপীড়ত মানুষের নাটক’ বা Theatre of the Oppressed (TO)’ ভাবনাসমৃদ্ধ নবনাট্যধারা সৃষ্টি করেন।

পরে নিপীড়িত মানুষের গণজাগরণের তৎপরতার কারণে দুজনকেই দেশ ছাড়তে হয়। অগাস্ট বোল বের্টল্ট ব্রেখ্ট ও স্টানিস্লাভোস্কি দ্বারাও প্রভবিত ছিলেন, কিয়দাংশে। বো’ল যে নাট্যঘরানা তৈরি করেন, সেটা কোনো সৌখিন নাট্যচর্চা ছিল না।

তিনি মার্ক্স প্রভাবিত ছিলেন বলেই নাটককে সমাজ-রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন। লক্ষণীয়, ব্রেখ্ট ও বো’লের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে নাটক নিয়ে কাজ করা এখনও একটি চলমান অনুশীলন। কারণ, নিপীড়ক সমাজ আগের মতোই আছে। বরং আরও বেশি নিপীড়ক হয়ে উঠছে।

‘বিস্ময়কর সবকিছুর নাট্যপ্রক্রিয়ায় বো’লের নাট্যকৃৎকৌশল প্রচ্ছন্ন বা নরমভাবে হলেও প্রযুক্ত হয়েছে। যদিও আলোচ্য নাটকের অভিলক্ষ্য নিপীড়িত মানষের মুক্তির নিশানা নিয়ে রূপায়িত হয়নি।

অগাস্ট বো’ল চেয়েছিলেন, নাটকের মধ্যে দর্শকবৃন্দ চলমান নাট্যক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হবেন। এবং তাদের নিজস্ব বয়ান নিয়ে বিকল্প বাস্তবতা তুলে ধরবেন। আর ‘বিস্ময়কর সবকিছু’ নাটকে দর্শককে সম্পৃক্ত করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা নাট্যরচয়িতা ও নির্মাতার বয়ান নিয়ে। এ প্রচেষ্টা বেশ সফল হয়েছে, প্রধান পারফরমার মহসিনা আক্তারের সাবলীল ও সহজ কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে। বলা বাহুল্য, কাজটি কিন্তু সহজ ছিলনা। কিন্তু আমার বা আমাদের দৃষ্টিতে নির্দেশক ও অভিনেতা এ পুলসিরাত অতি সহজেই পার হয়ে গেছেন; প্রশংসনীয়ভাবে।

ল্যাটিন আমেরিকার স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডেভিড ওয়ার্নার-এর “But why? টেকনিকটিও সুপ্রযুক্ত হয়েছে বাবা-মেয়ের হাসপাতালে যাত্রাপথের কথোপকোথনে। (তবে এ নাটকে এটার প্রয়োগ অবশ্য নির্দেশকের নিজস্ব ভাবনা থেকেও হয়ে থাকতে পারে)। পাওলো ফ্রেইরির মূল কৌশল ছিল নিপীড়িত মানুষের জীবনসংকটের কোনো সমস্যার মূল কারণ বা রুট কজ এনালিসিস করানো এবং তা নিপীড়িত মানুষদের দিয়েই। প্রশ্ন করো এবং প্রশ্ন করো- তবেই তুমি জানতে পারবে সমস্যার গভীর কারণ। ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে স্পেস তৈরি করে দেন। এখানে যেন তারই একখণ্ড প্রতিফলন ঘটেছে বাবা-মেয়ের সংলাপের মাধ্যমে। যতদূর জানি, নির্দেশক জামিল আহমেদ-ও চাইতেন তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করুক, তবেই তাঁরা প্রকৃতপ্রস্তাবে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারবেন।

‘বিস্ময়কর সবকিছু’তে বিষণ্নতার যে বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে, তা হয়তো নিপীড়িত মানুষের মধ্যেও বিরাজমান; কিন্তু এ নাটক যে ভাষায় ও যে আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়েছে, ফলে এর ঘটনাপ্রবাহ ও বক্তব্য তাদের বোধগম্য হবে বলে আমার মনে হয়নি; হয়তো নির্দেশকের মাথায় সে ইচ্ছা বা ভাবনা ছিলও না। এটি যেন একটি উত্তরআধুনকি কতিার মতো নান্দনিক প্রয়াস। পুরো নাট্যা-আলাপে মানুষের জীবনের খুব সুক্ষ একটা দিক ফুটিয়ে ‍তোলা হয়েছে- বিষণ্নতা, যা ধরা যায় না, ছোঁয়াও যায় না; শুধু অনুভব করা যায়, যা একজনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়, তার নিজের অজান্তে বা জান্তে। নাটক শেষে একজন তরুণ দর্শক আমাকে বলছিলেন, ‘নাটকটি নিরীক্ষাধর্মী ও উপভোগ্য বটে, তবে মায়ের বিষণ্ণতার কারণ এবং যেকোনো বিষণ্নতার গভীরতর বিশ্লেষণ এতে স্পষ্ট হয়নি।। এটা থাকা দরকার ছিল। এ দিকটা তাকে তেমনভাবে নাড়া দিয়ে যায়নি।’ আমার নিজেরও মনে হয়েছে, আরেকটু ঝাঁকুনি দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

ঘরোয়া পরিবেশে নাটকীয়তা সৃষ্টি ও অনবদ্য পার্ফরমেন্স

উপস্থিত দর্শকসারি বিস্ময়কর এক পার্ফমেন্স দেখেন মহসিনা আক্তার-এর অনবদ্য অভিনয়শৈলীর মধ্য দিয়ে। সে এক বিস্ময়করই বটে।
উপস্থিত দর্শকসারি বিস্ময়কর এক পার্ফমেন্স দেখেন মহসিনা আক্তার-এর অনবদ্য অভিনয়শৈলীর মধ্য দিয়ে। সে এক বিস্ময়করই বটে। ছবি: স্পর্ধা

ইকবাল রোডের কলাকেন্দ্রটি একটি ছোট সভাঘরের বেশিকিছু না। সেটাকে পার্ফরমেন্স স্পেস বানিয়ে ‘বিস্ময়কর সবকিছু’ পরিবেশিত হয়। আলোর ঝকমকানি বা আলো-আঁধারির কোনো বালাই নেই। কোনো রাখঢাক নেই; সহজ ও প্রকাশ্য।

মূল পার্ফরমার মহসিনা আক্তার খুব স্বাভাবিকভাবে নিজেকে ঘটনার সাথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং দর্শকদেরকেও সাথে নিয়েছেন যাদুকরের মতো। তেমন কখনো মনেই হয়নি যে, তিনি একটি শ্রমসাধ্য ও কষ্টকর কাজ করছেন একা- টানা ১ ঘণ্টা ৩০মিনিট ধরে। যেন কিছুই করছেন না তিনি। যেন আমাদের সাথে নিছক একটা গল্প করছেন; মাঝে মাঝে হাসিঠাট্টা করছেন এবং সেই গল্পে আমাদের শ্রোতা ও গল্পকার বানিয়ে নিচ্ছেন। তাৎক্ষণিকভাবে দর্শকসারি থেকে ৩/৪জনকে অভিনেতা বানিয়ে নিচ্ছেন। তাঁরাও যেন এই স্রোতে সাবলীলভাবে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। একদিকে নাটক  উপোভোগ করছেন, অন্যদিকে চরিত্র হয়ে সহজভাবে মূল অভিনেতার সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন। এ কৃতিত্ত্ব যেমন দর্শকদের, তার চাইতে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল অভিনেতা ও নির্দেশকের। কিন্তু দর্শক হিসেবে আমার কখনো মনে হয়নি যে, মূল পারফরমার গলদঘর্ম হচ্ছেন। নাটকের ফরমটিই এমন ছিল যে, মূল পারফরমার তাাঁর নিজস্ব কৃৎকৌশল অনায়াসে প্রয়োগ করে গেছেন। যদিও একজন পুরোনো নাট্যকর্মী হিসেবে আমি জানি, এ-কাজটি মোটেও একতালে বয়ে চলা নিস্তরঙ্গ নদীর মতো সহজ ছিলনা।

এ প্রদর্শীনেতে তাৎক্ষণিকভাবে বাবা হয়েছিলেন আমার পরিচিত একজন উন্নয়নকর্মী জাকির হোসেন, হাতকুকুরের শিক্ষিকা, হঠাৎ প্রেমেপড়া প্রেমিক একজন। তাদের সাবলীল সহজ কথোপকথনে মনেই হযনি যে, তাঁরা মহড়াকৃত নন। হাতকুকুরের শিক্ষিকা-তো বাজিমাৎ করলেন কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই।  এ কৃতিত্বও কি তাদেরকেই দিব না কি মহসিনা, এবং নির্দেশক নাট্যচিন্তক ও নাট্যনীরিক্ষায় অগ্রজন সৈয়দ জামিল আহমেদকে। নাকি ত্রিপক্ষীয় সবাইকে।

বিস্ময়কর সবকিছুর মূল পার্ফরমার: মহসিনা আক্তার

মহসিানা অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে কৌশলে ছন্দ ঠিকঠাক রেখে নিজে সংগীতশিল্পীদের মতো একটু ব্রিদিং স্পেস নিয়ে নিয়েছেন। সেটাও বেশ শক্তিমত্তার পরিচায়ক বটে! মহসিনার পার্ফরমেন্স ছিল অসাধারণভাবে সাধারণ। ওঁর   পার্ফরমেন্সে স্বাচ্ছন্দ্য ও সহজ কলাকৌশল দেখতে দেখতে আমার নিজের উদ্ভাবিত একটি শিখন-প্রক্রিয়া ‘মাইন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ’-এর কথা যেন মনে পড়ছিল; মাঝে মাঝে। যেখানে প্রশিক্ষক বা শিখনসহায়করা এমন সহজ-সাবলীলভাবে বন্ধুর মতো মিশে যাই শিক্ষার্থীর সাথে।

বিস্ময়কর সবকিছুর অনুবাদ বা দেশিয়করণ

ডানকান ম্যাকমিলানের মূল নাটকটি আমার পড়া নেই। তবে এর ভাবানুবাদ বিস্ময়কর সবকিছু বেশ চমৎকার হয়েছে। তেমন কোথাও মনেই হয়নি যে, এটি একটি অনুবাদকৃত নাটক দেখছি। যেন আমাদেরই দেশের নাটক। নিদের্শক ও অনুবাদক এ ক্ষেত্রে মুন্শিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, নির্দ্বিধায় বলা যায়। মূল পারফরমার এটি আত্মস্থ করেছেন এবং রূপায়িত করেছেন স্বচ্ছন্দে।আমি নিজে অভিনয় শুরু করি তা প্রায় ৫২/৫৩ বছর আগে; আর মঞ্চে অভিনয় ছেড়েছি তাতো বছর তিরিশেক আগেই। নির্দেশকের সাথে নাটক নিয়ে আলাপচারিতা হয়েছে প্রায় বছর ৪০ আগে। তখন সদ্য এনএসডিফেরত জামিল আহমেদের সাথে বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের আয়োজনে একটি রাজনৈতিক নাটকবিষয়ে কর্মশালায় অংশ নিয়েছি। এখনও প্রায়-নিয়মিত নাটক দেখি। তবে, এরকম অভিনব পরিবেশনা আগে চোখে পড়েনি।

এমনকি, আমার ভাবনাতেও কখনো আসেনি। এমনভাবে এটি সাজানো হয়েছে, যেন যেকোনো সময় খুবই সামান্য প্রস্তুতিতে এটি পরিবেশন করা যায়, যেকোনো সভাঘরে, বাড়ির ছাদে, এমনকি বড় ড্রয়িং রুমে। সাজসজ্জা, রংবাহারি আলো মিউজিকের ঝনঝনানী- এসবের বালাই নেই। অথচ দর্শকেরা অভিভূত হয়ে গল্প শুনছে এবং গল্পকার হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে পারছেন; অনায়াসে।

এবিষয়ে স্পর্ধার আহবানটিও আগ্রহোদ্দীপক- “আমরা আপনার বাড়িতে অথবা নিকটস্থ কোনো অভিনয়যোগ্য স্টুডিও, কনফারেন্স সেন্টার অথবা অন্য কোনো ঘরে নাটক উপস্থাপন করার ইচ্ছা পোষণ করি। অমাদের প্রয়োজন কেবল ২৫ ফুট লম্বা এবং ১৫ ফুট চওড়া একটি ঘর। যোগাযোগ : ০১৭১ ৭৮০৮৬৪০।

এ আহ্বানটিও কিন্তু অভিনব এবং উদ্দীপক।”

*** স্পর্ধার সাথে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন। ***

নাটকটির দু-একটি ভাবনা হতে পারতো-

১. বিস্ময়কর সবকিছুর তালিকা পড়ার জন্য প্রত্যেককে সম্পৃক্ত না করে কিছুজনকে সম্পৃক্ত করা;

২. মায়ের বিষণ্নতার কারণ আরেকটু সম্প্রসারিত করা;

৩. বিস্ময়কর সবকিছুর ঘটনা বর্ণনা ছিল চমৎকার- কিশোর, তরুণ, বড় হয়ে ওঠা, প্রেম-পরিণয়, বিয়ে-বিষণ্নতা-বিচ্ছিন্নতা-বিচ্ছেদ-অবিস্মরণ-পুনঃস্মরণ সবই ছিল বেশ গোছানো উপস্থাপন। কিন্তু ঠিক কীভাবে কী কারণে দুজনের  সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা গেলনা- সেটাকে কি আরও একটু স্পষ্ট করা যায় বা উচিত;

৪. অনিশ্চিত একটি নীরিক্ষাধর্মী নাট্য-আলাপে ছন্দপতনহীন সফল হয়েছেন স্পর্ধার কলাকুশলী ও এ নাটকের নির্মাতা। কিন্তু বিষণ্নতার কষ্টটা-ধাক্কাটা যেন আমার বা আমাদের অন্তরে একটু লেগেও তেমন বড়ভাবে লাগলো না। মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ মূল রূপকার ঝলসে উঠেছেন ঠিকই, কিন্তু ঠিক যেন স্থায়ীত্ব পায়নি তার ঝলসানো রূপটি;

৫. হতে পারতো নাটক শেষে দর্শকদের সাথে মতামত বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করা, যা এ প্রযোজনাটিকে আরও স্পষ্ট ও বিষ্ময়কর হতে সহায়ক হতে পারে।

৬. যেহেতু ছোট পরিসরে নাট্যক্রিয়া সম্পাদিত হয়, কলাকুশলী বিশেষ করে নির্দেশকের সাথে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেয়া যেতে পারে।

আমার উপর্যুক্ত ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ ভুল-ও হতে পারে। তবুও আপনাদের ভাবনার জন্য তুলে ধরলাম।

বিস্ময়কর সবকিছু নাটকের পার্ফমেন্স। ছবি: স্পর্ধা

শেষ কথা নয়

তবুও বলবো, যা দেখলাম তা মনে থাকবে দীর্ঘদিন। নাটকটি নিজেই যেন বিস্ময়কর একটি মাইলস্টোন। নিজেকে ভাঙার এরকম ঝুঁকি হয়তো দুএকজন নিতে পারেন। জামিল আহমেদ তাদের পথপ্রদর্শক-ও বটে! বিষ্ময়কর-তো বটেই! সবচেয়ে বিষ্ময়কর লেগেছে , একটি সাত বছর বয়সী কন্যা বা ছেলে তাঁর বিষণ্নতাক্লিষ্ট মাকে জীবনে বেঁচে থাকার অর্থ উপলব্ধি করানোর জন্য উপহার হিসেবে দুনিয়ার সব বিষ্ময়কর বিষয়ের তালিকা প্রণয়নের মতো একটি অভিনব এবং কিছুটা পাগলামো  কাজে হাত দেয় এবং তা প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়।

এ তালিকা শেষ হতে চায়না, তাকে ঘোরের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়, এবং দুনিয়ার সবকিছু বিষ্ময়কর বিষয় এতে স্থান করে নেয়। কিন্তু তারপরেও সে তার মাকে আত্মহননের প্রচেষ্টা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে না।  এ যেন জীবনানন্দ দাশের আত্মহনবিষয়ক কবিতা ‘আট বছর আগের একদিনে’র কথা মনো করিয়ে দেয়- ‘শিশু শুয়ে ছিল পশে, বধুটিও ছিল..ঘুম ছিল জোছনায়,…. মরিবার হলো তার সাধ! ’অবশ্য তৃপ্তির বিষয় হচ্ছে, ওই তালিকা তাঁর জীবনের এক বিষণ্নতাক্লিষ্ট মর্মান্তিক সময়ে নিজের আত্মহননের পথ থেকে নিজেকে জাগিয়ে রাখে। স্পর্ধার স্পর্ধা আছে, সাহস আছে, এমন একটি অনিশ্চিত আশ্চর্য নাট্যযাত্রায় দর্শককে টেনে আনার প্রচেষ্টায় প্রবৃত্ত হওয়ায়- এ কথা স্বীকার করতেই হবে, যেকোনো দর্শক বা সমালোচক-কে।

সবশেষে বলবো : খোলা আকাশ কি এত ভালো লাগতো, যদি কিছু কিছু মেঘ নাহি থাকতো! যে মানুষ আমৃত্যু সম্পূর্ণ সম্পন্ন জীবন যাপন করে গেলেন কোনো বিষণ্নতা বোধ ছাড়াই, ধরে নিন তিনি তাঁর জীবনটা যাপনই করেন নি, যথাযথ!

স্পর্ধার বিলিকৃত বর্ণিত বয়ানে বিস্ময়কর সবকিছুর সারসংক্ষেপ বা পূর্বাভাষ

বিস্ময়কর সবকিছু নাটকটি এক বিষণ্নতাক্লিষ্ট মায়ের একমাত্র সন্তানের জীবনকাহিনী। নাট্যক্রিয়ায় সাত বছরের সেই সন্তানের মা তার নিজের প্রাণনাশের চেষ্টা করে। মা’কে বেঁচে থাকরি অর্থ যোগান দেবার এক অদম্য বাসনা এই তালিকা রচনার এক উদ্দীপক ঘটনা। তালিকায় জীবনের বিষ্ময়কর সবকিছুর নাম লিপিবদ্ধ করে মাকে উপহার দেবার ইচ্ছা জাগে তার মনে, সে মনোযোগ দেয় একনিষ্ঠ চিত্তে সেই সাধ পূরণে। মাকে সেই তালিকা বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিতে ব্যর্থ হলেও সন্তানটির জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের দগদগে জলছবি হয়ে থাকে তালিকাটি। এই জলছবি দেখায়, কিভাবে ওই তালিকার সূত্র ধরে ওই সন্তানের জীবনে পরিণত বয়সে প্রেম-পরিণয় থেকে বিবাহ-বিচ্ছেদ এবং মায়ের মৃত্যু ঘটে। তবুও সে উঠে দাঁড়ায় অসামান্য এক প্রচেষ্টায়। সবার ওপরে জীবন সত্য। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেকোনো কিছু সম্ভব; অতএব নিজের প্রাণনাশের চেষ্টা কখনোই নয়। ‘বিষ্ময়কর সবকিছু’ এই বোধ সঞ্চারিত করে সহজ-সরল ভাষায়।

*** বোকা সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন এখানে। ***

মূল নাটক: ডানকান ম্যাকমিলান

অনুবাদ, দেশিয়করণ, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা: সৈয়দ জামিল আহমেদ। অভিনয় ও পোশাক: মহসিনা আক্তার।

বিস্ময়কর সবকিছু নিয়ে এই প্রতিক্রিয়াটি লিখেছেন প্রিয় বোকাজন সিরাজুদ দাহার খান


সিরাজুদ দাহার খান

সিরাজুদ দাহার খান

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয় নিয়ে বিদ্যায়তনিক অধ্যয়ন সেরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। রাজনৈতিক গণথিয়েটার ম্যুভমেন্টে তৎপরতা ছাড়াও প্রগতিপন্থী সাংস্কৃতিক ও তাত্ত্বিক সংগঠন বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সাথে নিবিড়ভাবে সক্রিয় ছিলেন। একসময় দু’চারকলম গদ্য-কবিতা-নাটক লিখলেও অনুশীলন অব্যাহত রাখেননি সচেতনভাবে; অথবা রাখতে পারেননি, জীবনজীবিকার অন্বেষণে বা এনজিওঘরানার মানব-উন্নয়নধারায় নিমগ্ন হওয়ায়। অতি সম্প্রতি, পেশাজৈবনিক লেখালেখির পাশাপাশি সৃজনশীল লেখার প্রতি নিবিষ্ট হচ্ছেন, ধীর লয়ে। নাট্যসমালোচক- মাঝে মাঝে সমালোচনা লেখেন। সম্প্রতি স্তালিন, ক্রাচের কর্ণেল ও জলপাইগুড়ি কলাকুশলী’র নাটক ‘শুক’-এর সমালেচনা লিখে দৃষ্টি কেড়েছেন।

শিক্ষা, অংশগ্রহণমূলক প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে মানবিক ও সমাজোন্নয়নের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম প্রণয়ন, রূপায়ন, মূলায়ন ও গবেষণায় অবদান রেখে চলেছেন গত ৩৫বছর। ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের রিসোর্স পারসন হিসেবে দেশের বাইরে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। প্রায় ১৮টি প্রশিক্ষণ-শিখনবিষয়ক ও রাষ্ট্রীয় নীতিপ্রভাবক কর্মকৌশল পরিচালনে সহায়ক অ্যাডভোকেসি পুস্তক ও নির্দেশনাগ্রন্থের প্রণেতা। দেশের একজন অন্যতম প্রশিক্ষণবিশেষজ্ঞ হিসেবে জনপরিচিত। ‘মাইন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক একটি উদ্ভাবনিমূলক দেশজ প্রশিক্ষণ-শিখন সঞ্চালনধারার উদ্ভাবক-রূপকার। এ ছাড়াও কিশোরী ও কিশোরদের আত্মসচেতনায়ন, জীবনদক্ষতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘সংলাপ’ ও ‘প্রত্যয়’ নামে দুটি শিখনপন্থার রূপকার। দেশি-বিদেশি কয়েকটি গ্রন্থের অনুবাদক।
২০২০ সালে এ লেখকের সর্বশেষ প্রকাশিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘খানসাহেবের খন্ডজীবন’ পাঠকমহলে আদৃত হয়েছে।
১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে মাতৃজেলা পাবনায় জন্ম এই নিবিষ্টচিত্ত মানুষের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *