
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক ভিন্ন ধারা তৈরি করেছেন আশরাফ শিশির। একদিকে মুক্তদৈর্ঘ্যের সিনেমা ‘আমরা একটা সিনেমা বানাবো’, অন্যদিকে দীর্ঘ কবিতা আর ব্যক্তিগত যাত্রাপথ- সবকিছুতেই তিনি নিজস্ব ভাষা খুঁজে নিয়েছেন। মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে নির্মাণ, কবিতার অন্তর্দৃষ্টি আর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা- এই তিনের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে তার শিল্পচিন্তা। বোকা’র সঙ্গে খোলামেলা আলাপে আশরাফ শিশির তুলে ধরলেন চলচ্চিত্র, কবিতা, রাজনীতি আর ব্যক্তিগত জীবনের নানান দিক।
বোকায় আপনাকে স্বাগতম। বোকা মূলধারা মূলস্রোতের কোনো প্রকাশনা নয়। বোকা নির্দিষ্ট একটা দার্শনিক পর্যবেক্ষণ থেকে তার প্রকাশনা চালিয়ে রাখবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ২০২০ সাল থেকে।
‘বোকা- সত্য, মজবুত, অনড়। বোকা পিছলে পড়ে না। বোকা সরল চলতে থাকে।’
বো-কাপা-ঠক আপনাকে ঊনিশ কিংবা কুড়ি প্রশ্ন করতে চায়… সরাসির শুরু করছি প্রশ্ন।
১) বোকা: আশরাফ শিশির- কোথায় আছেন কেমন আছেন?
আশরাফ শিশির: যাদু বাস্তবতা অথচ করুণ বাস্তবতার বর্ডার লাইনে একটা বাড়ি ভাড়া করেছি। সেখানে আছি। যেখানে সবাই কিছু না কিছু সময়ের জন্য ভাল থাকে। সেই অর্থে ভাল আছি। বাকিটা সময় খারাপ আছি।

Table of Contents
Toggleএক হাজার বছর ধরে আমরা একটা সিনেমাই বানাবো
-আশরাফ শিশির
২) বোকা: সেই সিনেমা- ‘আমরা একটা সিনেমা বানাবো’ সিনেমাটা কি আশরাফ শিশির বানাতে পেরেছিলেন (স্বপ্নভূক মনোজগত বাস্তবতার নীরিখে উত্তরটা চাই)?
আশরাফ শিশির: আসলে “আমরা একটা সিনেমা বানাবো” তে বলাই হয় যে, আমাদের সিনেমা বানানোর গল্পটা শেষ হয় না। এক হাজার বছর ধরে আমরা একটা সিনেমাই বানাবো। সেই অর্থে আশরাফ শিশির নামের কোন একক ব্যক্তি এই সিনেমাটা কোনদিনই পূর্নাঙ্গভাবে বানাতে পারবে বলে আমি মনে করি না। সে ২১ ঘন্টার বানিয়েছে, তাঁর মৃত্যুর পরে অন্য কেউ হয়তো সেটা কনটিনিউ করবে।
৩) বোকা
একজন চলচ্চিত্রকারকে নিবিষ্ট পর্যবেক্ষক হতে হয়- সময় এবং পর্যবেক্ষণ তার ভিতরে নানান যাতনা তৈরি করে। আপনার চলচ্চিত্র চিন্তায় কোন যাতনাগুলো আপনাকে নতুন নির্মাণে প্রেরণা যুগিয়েছে?
আশরাফ শিশির: “একটি অপূরণীয় ইচ্ছার যাতনা” অথবা “সেই শৈশব থেকে সবকিছু দেখে ফেলার যাতনা” আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাণ অথবা কবিতা লেখায় অথবা গদ্য চর্চায় প্রেরণা যুগিয়েছে বলে আমি মনে করি।
৪) বোকা: আপনি কবি হিসাবেও সমধিক পরিচিত। চলচ্চিত্রে কবিতাকে কীভাবে কাজে লাগিয়েছেন?
আশরাফ শিশির: আমাকে কবি হিসেবে কেউ খুব একটা চেনে না। আমি কবি হতে ঢাকা শহরে এসেছিলাম, ব্যর্থ হয়েছি। এখন ফেসবুকে লিখি। ফেসবুকে যেহেতু কবিতা না বোঝা মানুষের সংখ্যা বেশী, তাই কখনো কখনো সে কবিতা পপুলার ফ্লেভারে চলে যায়, সেটা আমি জেনেই লিখি যে, এই কবিতাগুলো কোনদিনও কবিতা হয়ে উঠবে না। তবে নিজের সঙ্গে নিজের বোঝা পড়ার যে জায়গাটা, সেটা ঠিকঠাক করে নিয়েছি বলেই আমার চলচ্চিত্রগুলো কখনো কবিতা, কখনো কবিতার সহচরী হিসেবে বহমান থেকেছে। থাকবেও।
৫) বোকা: কবিতা আর চলচ্চিত্রের দৃশ্যকল্পে কোনঠাসা হয়েছেন এমন একটা ঘটনার কথা বলুন? আরো সহজ করে বলি- আপনার মনে হচ্ছে ওটা কবিতা আবার কখনো মনে হচ্ছে না ওটা সিনেমা, ব্যাপারটা এমন…
আশরাফ শিশির: আমি যখন সিনেমা বানাই, তখন যে চশমাটা চোখে দেই, সেটা কবিতা। সেই শৈশব থেকে কবিতা মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে, সেটা অপারেশন করে ফেলে দিতে পারেনি মধ্যবিত্ত ছা-পোষা মন।
“একজন কবি চলচ্চিত্রকার মাত্রই রাজনীতি সচেতন।” এটা এখন স্যাটায়ার লাগে। বেশ কিছু শুয়োরের বাচ্চা কবি, চলচ্চিত্রকারকে দেখলাম ক্ষমতার রদবদলের সাথে পাল্টে গেছে।
৬) বোকা: একজন কবি চলচ্চিত্রকার মাত্রই রাজনীতি সচেতন। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
আশরাফ শিশির: প্রথমত, আমি ওই লোকটাকে খুঁজছি, যিনি লিখেছেন, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি”, আসলে ওই দেশটা আমরা অনেক আগেই হারিয়েছি। এখন চলছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। কিন্তু আগের আমলে কি সব ঠিকঠাক ছিল? না, একদমই না। আপনি বলছেন, “একজন কবি চলচ্চিত্রকার মাত্রই রাজনীতি সচেতন।”, এটা এখন স্যাটায়ার লাগে। বেশ কিছু শুয়োরের বাচ্চা কবি, চলচ্চিত্রকারকে দেখলাম ক্ষমতার রদবদলের সাথে পাল্টে গেছে। আগের আমলেও অনুদান ও পুরস্কার যেভাবে ভাগাভাগি করে খেত, এই আমলেও খাচ্ছে। তবে যাই হোক, আমি এ কথা সজোরে বলতে চাই যে, আমার ৯০% চলচ্চিত্র রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, কেন না সেটা আমার দায়বদ্ধতা।
৭) বোকা: আপনার চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই মানুষ মুক্ত দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সাথে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে; কেন ‘আমরা একটা সিনেমা বানাবো’ এতো দীর্ঘ চলচ্চিত্র হয়ে উঠে? এর মূল কারণটা কী?
আশরাফ শিশির: চর্মচক্ষে এর সাধারণ একটি কারণ হতে চলচ্চিত্রটাকে বাজারে প্রচলিত এক বা একাধিক দৈর্ঘের ফরমেটে না ফেলতে পারার অযোগ্যতা। যদিও বিষয়টি সত্য নয়। শিল্পকে কোন ফরমেটে আটকে রাখা যাবে না – এটা আমার কথা নয়, তবে আমি বিশ্বাস করি। আমি চলচ্চিত্রকেও সেই চোখে দেখি বলেই “ফ্রি লেংথ ফিল্ম” বা “ মুক্তদৈর্ঘ্য এর চলচ্চিত্রের কথা বলেছি বারংবার। তারই একটা উদাহরণ হতে পারে ‘আমরা একটা সিনেমা বানাবো”।
আমি সত্য ঘটনা অবলম্বনে (প্রকৃত অর্থে কিছু নাটকীয়তা রাখতেই হয়, না হলে মানুষ পর্দায় এতটা নির্মম সত্য দেখে জীবনের প্রতি মোহ নিয়ে সন্দীহান হতে পারে, যা কাম্য নয়) চলচ্চিত্রটি নির্মান করতে গিয়ে অনুসরণ করেছি ওই জনপদের মানুষকে, প্রকৃতিকে, সভ্যতাকে, বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীকেও। আর চলচ্চিত্রটি এগিয়ে গেছে একের পর এক বাঁধা পেরিয়ে। এতে আমার কৃতিত্ব সবচেয়ে কম, আমি অনুঘটক মাত্র।

৮) বোকা: আপনার দুধধান দীর্ঘ কবিতা! দীর্ঘের প্রতি আপনার আগ্রহটা এতো কেন (হাহাহা)?
আশরাফ শিশির: সত্যিই তাই। আমার সারাজীবনে দীর্ঘতম পাগলামী রয়েছে। আমি শৈশবে বন্ধুদের সাথে নিয়ে একটি সংগঠন করি এবং আমাদের শহরে ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এর একটি দেয়ালপত্রিকা প্রকাশ করি। তখন সবাই ক্লাস ফাইভ/সিক্সের স্টুডেন্ট। দুধধান আমার প্রথম দীর্ঘকবিতা নয়। যেটা নটরডেম কলেজে পড়ার সময় লিখেছিলাম, তার নাম ছিল “ যেহেতু মৃত্যু অতলনিদ্রা দীর্ঘকবিতা এক”, অনাগ্রহে পান্ডুলিপি হারিয়ে গেছে। পরে ২০০৩-৪ এ বোধহয় হ. মামুন আব্দুল্লাহ‘র সম্পাদনায় “বার্কিং ডগস্” নামের একটা লিটল ম্যাগাজিনে দীর্ঘকবিতা “দুধধান” এর একটি অংশ ছাপা হয়, এক রাতে ১৪০০ লাইন লিখে ফেলেছিলাম বলে। পরে ২০০৫ এ বই আকারে। এগুলো কখনো প্রেম, কখনো পাগলামী।
৯) বোকা: চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের সংকটগুলো কী কী মনে করছেন?
আশরাফ শিশির: কোন সংকট নাই। একটা বড় অংশের চলচ্চিত্র সম্মন্ধে কোন ধারণাই নাই। একদল অশ্লীল-কপি-ফরমূলা চলচ্চিত্রকে নিয়ে কাজ করছে। আরেকদল মোটামুটি রুচিশীল ও শিক্ষিত। এদের অনেকগুলো গোষ্ঠি আছে। একটি গোষ্ঠি ১০০% কপিবাজ, এরা মালায়লাম, কোরিয়ান, তার্কিশ গল্প নির্দ্বিধায় মেরে দিয়ে সংবাদপত্র, টিভি ও হালের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের জাহির করতে ভালবাসে। আরেকদল আছে শুধু সরকারের কোথায় কোথায় অর্থ আছে, যা সহজে চলচ্চিত্রের নামে গিলে ফেলা যায়, সেই প্রচেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছে। ফলে চলচ্চিত্রের পেছনে সংকটের সিলটা থেকেই যাচ্ছে।
১০) বোকা: আপনার কী মনে হয় না- বাংলাদেশে সংস্কৃতি অঙ্গনে এক ধরনের কুলীন সমাজ গড়ে উঠেছে। যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ দাবী করতে গিয়ে আসলে জন বিচ্ছিন্ন শিল্প তৈরি করেছে? যেমন ধর্ম বর্ণ ইত্যাদি দিয়েও মানুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করতে গিয়ে আলাদা হয়ে পড়েছে!
বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
আশরাফ শিশির: প্রকৃত মানুষ মানুষকে আলাদা করে রাখে না, দেখেও না। কুলীন সমাজ – সমাজের অবকাঠামোতে একটি বাই-প্রোডাক্ট। তাদেরকেও আমি অন্য চোখে দেখি না।
১১) বোকা: ঢাকার আজিজ মার্কেট শাহবাগ কেন্দ্রিক আমরা যারা কবিতা চর্চা করেছি লিটল ম্যাগ করেছি, তাদের মধ্যে দশকওয়ারি কবিতা এবং কবিদের বিন্যস্ত করার একটা ডামাডোল ছিল। আপনি আসলে কোন দশকের কবি? আর ব্যাপারটাকেই বা কীভাবে দেখেন?
আশরাফ শিশির: হ্যাঁ, ঢাকার লিটল ম্যাগাজিনে সাহিত্য চর্চায় বরাবরই গোষ্ঠিবদ্ধতা ছিল, তাঁরই প্রতিফলন, একেকটা গোষ্ঠি থেকে একটি বড় অংশকে বাদ দিয়ে নিজেদের সার্কেল – প্রয়োজনে কুকুর-বিড়ালকে ওই দশকের কবিদের তালিকায় সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যায় – তখন থেকে এখনও। আমি যতসম্ভব শূন্য দশকের, আবার হতে পারে যে, আমি বর্তমান দশকেরও। মোদ্দা কথা, কবি যখন হতে পারিনি, আমি আসলে যে কোন দশকের, কেন না বাংলা সাহিত্যের তাতে কিছু যায় আসে না।
১২) বোকা: (অপ্রাসঙ্গিক) আবার যদি ’৯০ দশক শূন্য দশকের সময়টা ফেরত পেতেন তাহলে কী কী করতেন?
আশরাফ শিশির: পুরোটা জীবন গ্রামে বা পাহাড়ে কাটিয়ে দিতাম। এখনও সুযোগ পেলে তাই করবো।
১৩) বোকা: আপনার মা-বাবা আর আপনার একান্ত শৈশবের কথা জানতে চাই, জানাবেন প্লিজ!
আশরাফ শিশির: বাবা-মা দু’জনই সরকারি চাকরী করতেন। তারা সারাজীবনই নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবন কাটিয়েছেন। এই নিয়ে মনে মনে আমার কষ্ট ছিল। পরে দেখলাম, আমারও নিম্ন-মধ্যবিত্ত হয়েই জীবন কাটছে পরিণত হয়ে। আমি ওই বিত্তের বৃত্ত থেকে বের হতে পারিনি। শৈশব মজার ছিল, কিন্তু শৈশবে অনেক কিছু বুঝে ফেলার দায়, আমাকে বোঝার কষ্ট নিয়ে বড় হওয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো, না বুঝলে ভাল হত।
চলচ্চিত্র, কবিতা আর অনড় যাত্রার গল্প নিয়ে বোকায় আশরাফ শিশির


১৪) বোকা: সবচেয়ে শক্তিশালী মনে হয়- এমন কয়েকটি শব্দ বা কবিতার লাইন পাঠকদের জন্য বলবেন?
আশরাফ শিশির: আমার সেই হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘকবিতার পান্ডুলিপিতে এরকম একটা লাইন ছিল-
“একদিন ফুল দেখে মনে হল ফুলেরও অধিক কিছু ফুল আছে ফুলের ভেতরে…”
ইন্টারমিডিয়েট পড়তে গিয়ে লেখা। বাইরের সাহিত্য পড়ার তেমন কোন সুযোগ হয়নি টেক্সটবুক ছাড়া। যদিও অনেক পরে এসে জেনেছি এমন একটা লাইন আছে-
“Rose is a rose is a rose is a rose.”
কবিতার শক্তি এখানেই। সে কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে। আসতে থাকে।
১৪) বোকা: কোন কবি কোন চলচ্চিত্রকার আপনাকে আবিষ্ট করেছিল (প্রিয় কবি এবং চলচ্চিত্রকারের তালিকা জানতে চাই)।
আশরাফ শিশির: এই মূহুর্তে তাদের কারো নাম মনে পড়ছে না…
১৫) বোকা: শুনেছিলাম আপনার নিজের জন্মভিটায় চলচ্চিত্রের হাউস গড়ে… বিস্তারিত জানবেন
আশরাফ শিশির: প্রশ্নটি অসমাপ্ত। এই সুযোগে উত্তরটা দিতে হল না।
পাঠক, ক্ষমা চাইছি। পূর্ণ প্রশ্নটি আশরাফ শিশিরকে বোকা পুনরায় পাঠাবে। এবং উত্তর জানবার চেষ্টা করবে…
১৬) বোকা: আমরা একটা সিনেমা বানাবো, গাড়িওয়ালা, গোপন-The Inner Sound, ৫৭০- আপনার পরবর্তী চলচ্চিত্র কী…?
আশরাফ শিশির: ২০০ চলচ্চিত্রের প্লান আছে, কনসেপ্ট আছে, কোনো কোনোটার চিত্রনাট্য ও শুটিং প্লান রেডি আছে। শুধু টাকা নাই। তবে ইচ্ছে আছে, টাকা ছাড়া সিনেমা বানানোর।
১৭) বোকা: ৫৭০ চলচ্চিত্রের নামটি অন্য রকম- কেন?
আশরাফ শিশির: ৫৭০ এই জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
৫৭০ বানাতে গিয়ে ডিজিএফআই-এর হেড কোয়ার্টারে জবাবদিহিতার আমন্ত্রণ পেতে হয়েছিল। সেন্সরে অদ্ভূত সব অবজারভেশন দিয়ে ছবিটা প্রায় ১ বছর ফেলে রাখা হয়েছিল। পরে কেটেকুটে যা দিয়েছিল, সেটা নিয়ে আমার অভিমান আপনি সকল দৈনিক পত্রিকাতেই দেখতে পাবেন। পরে ছবিটা আর রিলিজও দেওয়া হয়নি। -আশরাফ শিশির
বোকা: কেন?
আশরাফ শিশির: আমি কিছু প্রশ্নে ডিটেইলসে যেতে চাইনি। প্রচুর বলেছি। এখন বলতে ইচ্ছে হয় না। সাহস আর ভীতির জায়গা থেকে নয়, এখন আপাতত: ইচ্ছে করে না। যে জাতি নিজেদের ইতিহাসকে বারবার বিকৃত করে নিজেদের প্রয়োজনে, সেখানে ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। আমি ইতিহাসভিত্তিক ছবি নির্মাণ শুরু করেছিলাম ”আমরা একটা সিনেমা বানাবো” দিয়ে। না, সেটা কোন সরকারি ফান্ডের নয়। নিজের খরচে “যুদ্ধটা ছিল স্বাধীনতার” করেছি। ৭১ থেকে ৭৫-এ এসেছি। ৫৭০। এইভাবে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণের তাগিদ ছিল।
৫৭০ বানাতে গিয়ে ডিজিএফআই এর হেড কোয়ার্টারে জবাবদিহিতার আমন্ত্রণ পেতে হয়েছিল। সেন্সরে অদ্ভূত সব অবজারভেশন দিয়ে ছবিটা প্রায় ১ বছর ফেলে রাখা হয়েছিল। পরে কেটেকুটে যা দিয়েছিল, সেটা নিয়ে আমার অভিমান আপনি সকল দৈনিক পত্রিকাতেই দেখতে পাবেন। পরে ছবিটা আর রিলিজও দেওয়া হয়নি।
১৮) বোকা: কবিতায়, চলচ্চিত্রে কিংবা মানব কল্যাণে কোন বাংলাদেশকে দেখতে চান?
আশরাফ শিশির: পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যেখানে বৃষ্টি দেখলে মানুষ কাজ-কাম বাদ দিয়ে গরম গরম খিচুড়ি তুলে দেয় হাঁড়িতে আর প্রেমে পড়ে; আর সেই বৃষ্টি আর প্রেমের কবিতা লেখে। বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর মধ্যে একটি। কিছু নাই, তবু যেন অনেক কিছু আছে। বাংলাদেশ গায়েগতরে গরীব হলেও তাঁর একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত লুক আছে। অনেকটা আমার মত। কবিতায়, চলচ্চিত্রে কিংবা মানব কল্যাণে কোন বাংলাদেশকে ওই জায়গাতেই দেখতে চাই আমি। একটু বৃষ্টি হলে যারা খিচুড়ি চড়িয়ে দেয়। এত প্রেম পৃথিবীর কোথায় পাবেন আপনি! শুধু এদেশে জন্ম নিয়ে যারা অন্য দেশের তাবেদারি করে, তারা ওইসব দেশে চিরতরে চলে গেলে হয়তো দেশটা শুদ্ধ হয়ে যেত মাঝে মাঝে মনে হয়।

১৯) বোকা: ‘মানুষ আশরাফ শিশির’ তার জার্নিটা আমাদের সাথে শেয়ার করবেন…?
আশরাফ শিশির: আদ্যোপান্ত পরাজিত মানুষ। প্রচুর প্রেম পেয়েছে জীবনে, প্রচুর দুঃখও আছে তার খাতায়। ভীষণ প্রতিশোধপরায়ণ, অথচ একটা পিঁপড়াকে মারতেও দশবার ভাবে। পৃথিবীর অন্যতম অলস ব্যক্তি যে তার জীবনের ৬০-৭০ শতাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে, কারণ সে কখনোই একটা নির্ঘুম জীবন চায়নি। লোকটা খারাপদের মধ্যে কিছুটা ভাল মানুষ। জীবনের জার্নিটা শেষ বলা যেতে পারে স্বাচ্ছন্দ্যেই, কেন না এখন পতনের বয়স, এই পতন মৃত্যুর দিকে যাত্রার একটি অনিশ্চিত সময়কালকে নির্ধারণ করে, যদিও মৃত্যু অনিবার্য, নিশ্চিত…
বোকা: ধন্যবাদ আপনাকে!
আশরাফ শিশিরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই তার কথাগুলো বোকার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। তার কথার ভিতর দিয়ে আমরা অনুভব করলাম শিল্পীর মনের গভীরের যাতনা, সংগ্রাম আর স্বপ্নগুলো, যা তাকে প্রতিনিয়ত নতুন সৃষ্টির পথে এগিয়ে নেয়। আমাদের এই আলাপ এখানেই শেষ নয়- এটা চলতে থাকবে, কারণ বোকা বিশ্বাস করে ‘তার’ মতো নির্মাতাদের ভাবনা থেমে থাকে না, বরং সময়ের সঙ্গে নতুন ভাবে ফিরে ফিরে আসে। তার আগামীর কাজগুলো আমাদেরকে আবারও নতুন করে ভাবতে, প্রশ্ন করতে আর অনুভব করতে শেখাবে- এই শুভকামনা নিবেদন করছি! -বোকা